.....................   ................................

যেথায় যে জন

বিশ্বদেব চট্টোপাধ্যায়

কুড়ি বিঘে জায়গা জুড়ে বিরাট ফার্ম হাউসের ঠিক মাঝখানের বাংলো প্যাটার্নের গেস্ট হাউসের সামনে তিনটে টাটা-সুমো এসে থামতেই নীলেশ বারন্দা থেকে নেমে এলো। ওর পরনে সিল্কের একটা বাটিক-প্রিন্ট লুঙ্গি। গায়ে হাফ-হাতা শর্ট-পাঞ্জাবি এবং বিস্ময়করভাবেই ওর পায়ে লাল ক্যাম্বিসের কেডস্!
গাড়িগুলো থামার সঙ্গে সঙ্গে দু'পাশের দরজাগুলো ঝটপট খুলে গেল।  বছর আট-দশের দুটো ছেলেমেয়ে গাড়ি থেকে নেমেই ছোটাছুটি শুরু করে দিল। । তিনজন মহিলা, দু'জন পুরুষও গাড়ি থেকে ধীরেসুস্থে নেমে নীলেশকে ঘিরে দাঁড়াল। স্বল্পকেশ এক রোগাটাইপের ভদ্রলোক, যার পরনে বারমুডা প্যান্ট ও গায়ে জেনিফার লোপেজের উচ্ছ্বল হাসি-আঁকা ঢলঢলে গেঞ্জি, নীলেশের সুপুষ্ট ডানহাত দুহাতে চেপে ধরে বলল--
--হাই নীলু! আমরা কিন্তু সত্যি সত্যি তোর ফার্ম হাউসে উইক-এণ্ড এনজয় করতে এলাম। মানতেই হবে তোর সাহস আছে...।

নীলেশ বৈদ্যনাথ বক্সির উচ্ছ্বাসের উত্তরে একটু গর্বের হাসি হেসে কিছু বলতে যাচ্ছিল কিন্তু তার আগেই বক্সির বউ তন্দ্রা বক্সি যথারীতি তার চিরন্তন স্খলিত আঁচল সামলাতে সামলাতে যথেষ্ট সময় নিয়ে নিজের আকর্ষণের ঝাঁঝালো তীব্রতাকে সকলের চকচকে চোখে ছড়িয়ে দিয়ে বলল--
-- নীলুদার হিম্মতই আলাদা। তোমাদের মতো দাসত্ব না করে দেখ তো কী সুন্দর একটা আস্ত নন্দন কানন বানিয়ে ফেলেছেন! সত্যি ভাবা যায় না...। শেষ বাক্যটা একটু টেনে একপাক ঘুরে নিল তন্দ্রা। বদ্যিনাথ, যার যাক নাম বদু, তন্দ্রার এইসব ভাবভঙ্গিতে কেন যেন আজও বিচলিত বোধ করে। স্ত্রীকে আর পাঁচজন পুরুষের তুলনায় প্রথম প্রথম একটু বেশিই ভালবেসেছিল। কিন্তু স্বচ্ছল সংসারে এসে যত দ্রুত তন্দ্রা আধুনিকা হচ্ছিল ততই বৈদ্যনাথ নামটা তাকে কাঁটার মতো বিঁধতে শুরু করেছিল। একটা কর্পোরেট হাউসের এজিএম –এর নাম বৈদ্যনাথ বক্সি! শুধু তাই নয়, ওর ডাক নাম 'বদু' প্রথম যেদিন ওই নামটা শুনেছিল সেদিন থেকে টানা সাতদিন তন্দ্রা তার শরীর স্পর্শ করতে দেয়নি বৈদ্যনাথকে। বদুর কোনো কথাতেই তন্দ্রার মেজাজ নরম না হওয়াতে নীলেশ এবং তাপসের পরামর্শে বিবাহ বিচ্ছেদের কাগজপত্র নিয়ে তন্দ্রার মুখোমুখি দাঁড়াল।

কাগজপত্র হাতে নিয়ে গোল গোল বিস্ফারিত চোখে মেলে নতুন করে বৈদ্যনাথকে বুঝতে চেষ্টা করছিল তন্দ্রা। বৈদ্যনাথ যে তার নামের প্রাচীনতার কারণে আর অপমান সইতে রাজি নয়, সেটা তন্দ্রা বোঝামাত্র নিজের অবস্থানটাও স্পষ্ট বুঝে ফেলল। বৈদ্যনাথকে আচমকা বিমূঢ় করে তন্দ্রা ঝাঁপিয়ে পড়েছিল ওর ওপর। অপ্রস্তুত বৈদ্যনাথ বেশ কিছু কিল-ঘুঁষি হজম করতে করতে বন্ধুদের উদ্দেশ্যে ছাপার অযোগ্য কিছু বিশেষণ সাহেবি ঢঙে উচ্চারণ করে যাচ্ছিল। শেষ পর্যন্ত বৈদ্যনাথের নামের প্রাচীনতার ব্যাপারটা ভুলে যেতে পেরেছে তন্দ্রা।

ইতিমধ্যে রান্নাঘর থেকে প্রায় ছুটেই বেরিয়ে এসেছে অঞ্জনা। নীলেশের বউ। অঞ্জনার সঙ্গে তাপসের একটা ইমোশন্যাল সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল নীলেশের অজ্ঞাতেই। তাপস একটা বড় মাপের নিউজ-হাউসের আর্ট-ডিরেক্টর। শান্তিনিকেতনের কলাভবন থেকে ছবি আঁকা শিখেছে। ভাল রবীন্দ্রসঙ্গীতও গায়। মেয়েদের কাছে সঙ্গত কারণেই ওর একটা বিপজ্জনক আকর্ষণ আছে। তাপসের বউ শর্মিলা সেটা বোঝে এবং কিছু কিছু টের পায়। যা টের পায় তার চেয়ে অনেক বেশি কল্পনা করে সবসময়েই প্রায় বিমর্ষ থাকে। তাপসের উত্তপ্ত সঙ্গও ওকে উজ্জীবিত করতে পারে না। ফলে তাপসের মনেও মেঘের আনাগোনা লেগেই থাকে।
গাড়ি থেকে নেমে তাপস অন্যমনস্কভাবে কিছুটা দূরের পুকুরটাকে ঘিরে থাকা নারকেল গাছগুলোর দিকে তাকিয়ে ছিল। অঞ্জনাকে দ্রুত সিঁড়ি টপকে বারন্দা থেকে নেমে আসতে দেখে অঞ্জনার দিকেই তাকিয়ে থাকল নিঃসঙ্কোচে। শর্মিলার দৃষ্টি আটকে গেল তাপসের মুখের ওপর। তাপসের মুখের ওপর দেখতে পেল একঝলক আলো। শর্মিলার অন্ততঃ তাই মনে হল। নীলেশও অঞ্জনাকেই লক্ষ্য করছিল।

বাচ্চাদুটো ছোটছুটি করতে করতে বেশ কিছুটা দূরে চলে গেছে। নীলেশ দেখল এদের সঙ্গেই আসা একটা মেয়ে, বেশ ছিমছাম এবং মোটামুটি সুন্দরী, আপনমনে একা একা ফার্মহাউসের এদিক-ওদিক ঘুরে বেড়াচ্ছে। নীলেশ ওকে চিনতে পারল না। নামও জানে না। তবে মেয়েটির সাজ-সজ্জায় কোনোরকম উগ্রতা নেই, নেই অসহ্য আধুনিকতা। নীলেশের বেশ ভাল লাগছিল মেয়েটিকে। দূর থেকে লক্ষ্য করছিল মাঝে মাঝে। বাংলোর ঠিক সামনেই একটু বাঁ দিক ঘেঁষে দু'টো বড় বড় রঙীন ছাতার নীচে বাঁশের তৈরি দুটো টেবিলের চারপাশে চারটে করে বাঁশেরই তৈরি চেয়ার পাতা আছে। আকর্ষণীয় ওদের গঠনশৈলী। বৈদ্যনাথ বা বদু দু'পা দুদিকে ছড়িয়ে দিয়ে একটা চেয়ারের ওপর নিজেকে প্রায় ভাসিয়ে দিল। বদুর রোগা রোগা দুটো পায়ের ছাড়ানো ভঙ্গি তন্দ্রা বক্সির মোটেও ভাল লাগছিল না। একে তো বিদঘুটে পোষাক, তার ওপর ওই ভঙ্গি! বুড়ো ভামগুলো কেন যে ওই ঢোলা হাফ-প্যান্টগুলো পরে কে জানে! বিশ্রী লাগে দেখতে। চারপাশের মনোরম দৃশ্যের মাঝখানে বদুকে একটা জংলী কাঁটাঝোপের মতো অসহ্য লাগছিল তন্দ্রার। কিন্তু কিছু করার নেই।

একে একে তাপস শর্মিলা তন্দ্রা অঞ্জনা এবং নীলেশ চেয়ারে নিছকই আড্ডা মারার মেজাজে বসল। বদু জুত করে দুটো পা টেবিলের ওপর তুলতে গিয়ে তন্দ্রার চোখের দিকে চোখ পড়তেই সামলে নিল। এতটা বাড়াবাড়ি তন্দ্রার পক্ষে বোধহয় আজ সহ্য করা সম্ভব হবে না। বদু অতঃপর তৃষ্ণার্ত ভঙ্গিতে নীলেশের দিকে তাকিয়ে বলল,
--একটু জলের ব্যবস্থা হয় না ব্রাদার!
অঞ্জনা তাড়াতাড়ি টেবিলের ওপর রাখা মিনারেল ওয়াটারের বোতলটা বৈদ্যনাথের দিকে এগিয়ে ধরতেই নীলেশ এবং বৈদ্যনাথ হো হো করে হেসে উঠল। শর্মিলা অঞ্জনার দিকে তাকিয়ে বলল,
--বদু'দা মুখ ধোওয়ার জন্যে জল চায় নি। 'পান' করার জল চাইছে বোধহয়।
বোধগম্য হল অঞ্জনার। নীলেশ উঠে গেল ভেতরে। বদু অঞ্জনার দিকে তাকিয়ে বলল,
--ব্রেকফাস্টের কি আয়োজন করেছ অঞ্জনা?
--কি খাবেন বলুন?
--কুচো চিংড়ি দিয়ে গরম গরম মটরডালের বড়া আর খাসির চর্বির বড়া খাওয়াতে পার?
--নীলেশ জানত এসব লাগবে। আয়োজন আছে। নিয়ে আসছি এখনি।
অঞ্জনা উঠে যেতেই শর্মিলা তাকালো তাপসের দিকে। তাপস অঞ্জনার চলে যাওয়ার ছবি আঁকছিল মনে মনে। শর্মিলা মনে মনে সেই ছবির ওপর এক শিশি কালো রং ঢালছিল ঠিক সেই মুহূর্তেই।

নীলেশকে মনে মনে কামনা করে শর্মিলা। নীলেশের কথা-বার্তা, সৌন্দর্য্যবোধ, স্মার্টনেস এবং মেদহীন টানটান শরীর নিয়ে নিষিদ্ধ ভাবনায় ডুব দিতে ওর কোনো গ্লানিবোধ কেন হয় না তা বোঝে না। অঞ্জনাও তো তাপসের সঙ্গে.....একটু ঢোক গিললো শর্মিলা.....সত্যি কি কিছুই করে নি? নিশ্চয়ই কিছু গভীর গোপন ব্যাপার আছে। নীলেশ কি কিছুই জানে না, নাকি বোঝে না!

নীলেশ 'জল-টল' এবং আনুষঙ্গিক সব কিছু নিয়ে এসে টেবিলে রাখলো। দু'টো বড় বড় প্লেটে সত্যি সত্যি কুচো চিংড়ি এবং খাসির চর্বির বড়া নিয়ে এল অঞ্জনা। বদু পরিবেশনের দায়িত্ব নিয়ে বোতল আর গ্লাসের ওপর ঝুঁকে পড়ল। তাপস বলল,
--একটু মুখ-হাত ধুতে পারলে ভাল হত--
--ওয়াশরুমে যেতে চাস?' নীলেশ জানতে চাইল।
--হ্যাঁ...মানে--
--ওকে ভেতরে ওয়াশরুমটা দেখিয়ে দিয়ে এস অঞ্জনা--
নীলেশের কথায় তাজ্জব হয়ে গেল শর্মিলা। তাপস আর অঞ্জনা ঘরের ভেতরে চলে গেল। নীলেশের মুখের দিকে তীব্র দৃষ্টিতে তাকিয়ে কিছু একটা বুঝতে চাইছিল শর্মিলা। নীলেশ কি ইচ্ছে করেই তাপস আর অঞ্জনাকে অন্তরঙ্গ হতে সুযোগ দিল? অঞ্জনাকে না পাঠিয়ে তো তারই যাওয়া উচিত ছিল। তাহলে?


নীলেশ গ্লাসে হাল্কা চুমুক দিতে দিতে লক্ষ্য করছিল মেয়েটা পুকুরের ধারে চলে গেছে। পুকুরের জলে ফুটে থাকা বড় বড় সাদা আর লাল শালুক দেখছে মুগ্ধ চোখে বাংলাদেশ থেকে এই সব শালুকের বীজ আনিয়েছে নীলেশ। তাপস কিংবা বদু কেউই মেয়েটার সঙ্গে পরিচয় করায় নি। তার আগেই অবশ্য মেয়েটা পায়ে পায়ে বাগানের ভেতরের দিকে চলে গিয়েছিল। তাপস একটু পরে ওদের পাশে রুমালে মুখ মুছতে মুছতে এসে বসল। শর্মিলা শাড়ির আঁচল ঠিক করার অজুহাতে তাপসের দিকে একটু বেশি রকম ঝুঁকে ওর শরীর থেকে উঠে আসা একটা অচেনা গন্ধ পেল। সুযোগ পেয়ে নিশ্চয়ই অঞ্জনাকে জাপটে ধরেছিল। কিন্তু পুরুষগুলো এত বোকা হয় কেন কে জানে! ওদের গায়ে অন্য মেয়ের গন্ধ যে দীর্ঘক্ষণ লেগে থাকে তা টেরই পায় না। কিন্তু অঞ্জনার শরীরে তাপসের গন্ধ পাবে না নীলেশ। ছেলেদের গায়ের গন্ধ শুধু বাতাসই কয়েকমুহূর্ত ধরে রাখতে পারে, মেয়েদের শরীর নয়।

শর্মিলার ইচ্ছে হচ্ছিল একটা বড় হাতুড়ি দিয়ে নীলেশের মাথায় আঘাত হানতে। ওর পাতলা লাল টুকটুকে ঠোঁট দাঁতের ওপর শক্ত হয়ে চেপে বসছিল। নীলেশের সঙ্গে আজ একটা বোঝাপড়া করতেই হবে। নীলেশ তাপসের দিকে তাকিয়ে জানতে চাইল--
--অঞ্জনা কি করছে? এল না কেন?
--বোধহয় রান্নাঘরে। আসবে এখনি--
হাত বাড়িয়ে একটা গ্লাস তুলে নিল তাপস। শর্মিলা চাইছে তাপস একবার অন্ততঃ তার দিকে সরাসরি তাকাক। তাহলে শর্মিলা ভেবে নেবে ঘরের মধ্যে তাপস আর অঞ্জনার মধ্যে সামান্য একটু জড়াজড়ি ছাড়া আর কিছুই হয় নি। কিন্তু তাপস শর্মিলার দিকে ইচ্ছে করেই তাকাচ্ছে না। তার মানে গাঢ়তর কিছু ঘটেছে স্বল্প সময়ের মধ্যেই। তাপসের ভেতরে কি মানুষের ক্ষিদে ছাড়া আরো কিছু আছে? শর্মিলার মাথায় রক্ত চড়তে শুরু করল।

অঞ্জনা এল একটু পরে। নীলেশ আড়চোখে অঞ্জনাকে দু'এক মুহূর্ত লক্ষ্য করে বুঝল ইতিমধ্যে ওর শরীরে কিছু শারীরিক উপসর্গ দেখা দিয়ছিল যার আভাস নীলেশ দেখতে পাচ্ছে। এসব তো ওর খুবই চেনা। সব বুঝেও নীলেশ কি-ই বা করতে পারে? বাধা দেবার কিংবা মারামারি করার অবস্থানে ওরা কেউই নেই। যে যার অবস্থানে ইচ্ছে মতো বিচরণ করার স্বাধীনতার অধিকারী। বিশেষ করে শিক্ষিত স্বচ্ছল আধুনিক পরিবারে। তাপসকে অঞ্জনা ভালবাসে, নীলেশকে বাসে না। কিন্তু অপছন্দও করে না। কাউকে ভালবাসার অধিকারকে কেড়ে নেওয়ার সভ্য মানুষের পক্ষে সম্ভব কিনা কিংবা নিলেও তা সুখকর হয় কি না নীলেশের মতো মানুষের পক্ষে তা যাচাই করা সম্ভব নয়।

শর্মিলার দিকে চোখ পড়তেই ভেতরে ভেতরে একটু চমকে উঠল নীলেশ। শর্মিলা অপলকে ওর মুখের দিকেই তাকিয়ে ছিল। চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়াল নীলেশ। বলল,
--তোরা চালিয়ে যা। আমি একটু দেখে আসি লেবাররা কি করছে। না দেখলে খুব ফাঁকি দেয়।

আসলে পুকুরের ধারে ইতস্ততঃ ঘুরতে থাকা মেয়েটার প্রতি একটা আকর্ষণ অনুভব করছিল নীলেশ। মনে হচ্ছিল ওর সঙ্গে দুটো কথা বললে ভাল লাগবে। মেয়েটা ওদের সঙ্গে চেয়ারে এসে বসে নি। ওদের সঙ্গে গাল-গল্পে অংশ নেয় নি। কেন? এই প্রশ্নের উত্তরটা পাওয়া দরকার। নীলেশ মেয়েটির ঠিক পেছন থেকে বলে উঠল,
--কি দেখছেন?
চমকে উঠল মেয়েটা। দ্রুত ঘুরে তাকাল নীলেশের দিকে। একটু জড়োসড়ো হয়ে জিজ্ঞেস করল--
--এই পুরো জায়গাটা আপনার?
--হ্যাঁ। মোট আট একর মানে চব্বিশ বিঘে জমি আছে।
--এই পুকুর, ঐ আম-কাঁঠালের বাগান, ধানক্ষেত....এত এত নারকেল গাছ, ওদিকে ঐ হাঁস-মুরগী সব আপনার?
--হ্যাঁ।
--পুকুরে মাছ আছে?
--আছেই তো। ইলিশ মাছও আছে--
--যাঃ! পুকুরে আবার ইলিশ মাছ হয় নাকি?
--হয়। বাঁচানো খুব কঠিন। দুপুরে এই পুকুরের ইলিশ মাছ ভাজা আর পাতুরী খাবেন।
মেয়েটি অবিশ্বাস্য দৃষ্টিতে পুকুরের প্রায় নিস্তরঙ্গ জলের দিকে অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল। নীলেশ দেখল মেয়েটির কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম জমেছে। নীলেশ জিজ্ঞেস করল,
--আপনার নামটা কিন্তু জানা হয় নি।
--জয়ন্তী। আচ্ছা, আপনাদের তো বাজারই করতে হয় না, না? সবই তো আছে--
--উল্টে কতকিছু রোজ বাজারে পাঠাতে হয়। ভারি ঝকমারির ব্যাপার। জয়ন্তী আপনি ডাব খাবেন?
--কে গাছে উঠবে? আপনি?
বলে খিল খিল করে হেসে উঠল জয়ন্তী। নীলেশের মনে হল গোটা ফার্ম হাউস জুড়ে নীল-সবুজের সমুদ্র গড়িয়ে গেল। পুকুরের জল ঘেঁষে আগাছা পরিষ্কার করছিল একটি লোক। চটপট পুকুরে ঘষে ঘষে হাত ধুয়ে তরতর করে একটা ছোট নারকেল গাছে উঠে গেল। দুটো কচি ডাব ছিঁড়ে মাটিতে ধুপধাপ ফেলে দিল। তারপর ফের তরতর করে নেমে এসে একটা হেঁসো দিয়ে ডাবের মুখ কেটে দু'জনের দিকে এগিয়ে দিল।

চুমুক দিয়ে ডাবের জল খেতে গিয়ে জয়ন্তীর বুকের কাপড় একটু ভিজে গেল। এভাবে ডাব খাওয়ার অভ্যেস নেই ওর। ডাবে চুমুক দিতে দিতেই ওরা পায়ে পায়ে এগিয়ে যাচ্ছিল গোলাপ বাগানের দিকে। কাছাকাছি এসে মুগ্ধ হয়ে গেল জয়ন্তী। লাল হলুদ সাদা কালচে-লাল ছাড়াও আরো কত রঙের গোলাপ! এতরকমের গোলাপ একসঙ্গে জয়ন্তী কখনো চোখে দেখে নি। নীলেশ জিজ্ঞেস করল,
--গোলাপ ফুল ভালবাসেন?
--বাহ্! কে না ভালবাসে?
নীলেশ একটা গাঢ় লাল আর একটা হলুদ গোলাপ ছিঁড়ে ওর হাতে দিল। চোখে জল এসে যাচ্ছিল জয়ন্তীর। ভাললাগায় মরে যেতে ইচ্ছে করছিল ওর। খুবই নিচু স্বরে নীলেশের চোখের দিকে তাকিয়ে বলল,
--আপনি খুব সুন্দর মানুষ!
তাজ্জব হয়ে গেল নীলেশ। এত সহজে এমন হীরকদ্যুতি বিচ্ছুরিত কয়েকটা শব্দ যে কেউ উচ্চারণ করতে পারে তার বিশ্বাস হচ্ছিল না। নিজের কানদুটোতে একবার হাত বুলিয়ে নিল। কথাটা বলে ইতিমধ্যেই জয়ন্তী কয়েক কদম এগিয়ে গেছে। নীলেশ তাকাল দূরের তাপস-বদু-অঞ্জনা-শর্মিলাদের দিকে। ওরা সকলে এদিকেই তাকিয়ে আছে। নীলেশের মনে হল ওরা নীলেশের সঙ্গে জয়ন্তীকে জড়িয়ে কিছু রুগ্ন কথা ভাবছে। অথচ নীলেশের মনে কোনো রুগ্ন ভাবনার ছায়াপাতও ঘটছে না। মনটা ওর অনেকদিন পরে অদ্ভুত এক ভাললাগায় ভরে উঠছে।

জয়ন্তীর পিছু পিছু নীলেশ জটলার মাঝখানে এসে গেল। জয়ন্তীকে দেখামাত্র শর্মিলা তেলেবেগুনে জ্বলে উঠল,
--ছেলেমেয়ে দু'টোকে চোখে চোখে রাখার জন্যেই তোমাকে আনা হয়েছিল। কিন্তু তারা কোথায়? আর তুমিই বা কি করছিলে? আশ্চর্য!
চকিতে একবার নীলেশের দিকে তাকিয়ে মাথা ঝুঁকে নির্বাক দাঁড়িয়ে রইল জয়ন্তী। গোলাপ ধরা হাতটা পেছনে লুকিয়ে রেখেছে। তন্দ্রা শর্মিলার পাশ থেকে ঝাঁঝিয়ে উঠলো,
--সঙের মতো দাঁড়িয়ে রইলে কেন? দেখো বাচ্চা দুটো কোথায় গেল?
মাথা নিচু করেই দ্রুত চোখের সামনে থেকে পালালো জয়ন্তী।

নীলেশের সামনে এসে দাঁড়াল অঞ্জনা--
--তুমি বোধহয় জানতে না জয়ন্তী শর্মিলার কাজের মেয়ে। এমনভাবে ডাব খাওয়াচ্ছিলে যেন তোমার হারানো প্রেমিকা--
--শুধু ডাব? জাহাঙ্গিরের স্টাইলে কেমন গোলাপ নিবেদন করল বলো?
একটা প্রকাণ্ড ঢেঁকুড় তুলে ধুনোর মধ্যে ঝোড়ো বাতাস ছুঁড়ে দিল বদু। শর্মিলা নীলেশের দিকে একটা তীব্র ধিক্কারের দৃষ্টি হেনে বলে উঠল,
-- তোমার কাছ থেকে এটা আশা করা যায় না নীলেশদা। ছিঃ!
অঞ্জনা শর্মিলার রক্তফোটা মুখের দিকে তাকিয়ে মনে মনে হাসল। আসলে গোলাপ দুটো ওর খোঁপার বদলে চলে গেল কিনা ওরই কাজের মেয়ের হাতে! নীলেশ সকলের মুখের দিকে একবার দৃষ্টি ঘুরিয়ে নিয়ে বলল,
--তোমরা বললে বলে জয়ন্তীর পরিচয় বদলে গেল! না হলে কয়েক মিনিট আগেও তোমাদের মতোই একজন ছিল আমার কাছে। আমার অন্ততঃ তাই মনে হচ্ছিল। ডাবের জল কিংবা গোলাপ ফুল ওর প্রাপ্য ছিল। তোমাকে অঞ্জনা, যদি অচেনা কেউ কাজের মেয়ে কিংবা আরো খারাপ কিছু ভাবতো তাহলে সেটাই সেই মুহূর্তে তোমার পরিচয় হতো, না কি? এখনকার এই মিথ্যের মতো? জয়ন্তীর সঙ্গে তোমাদের অবশ্যই একটা গুরুতর পার্থক্য আছে তা হল, জয়ন্তী তার নিজের বিন্দুতে স্থির এবং অত্যন্ত খাঁটি। তোমাদের তা কেন মনে হচ্ছে না বল তো?

***

গ্রাফিক্স - ইন্টারনেট

সূচীপত্র