সম্পৃক্তি


এ গল্পের আজ হলো ২৫ শে ডিসেম্বর। ২০০৪।


রাত সাড়ে নটা। চেন্নাই এগমোর ষ্টেশনে ব্যঙ্গালোর এক্সপ্রেসে চড়েই বিকাশ হাসপাপি জুতোটা খুলে একটু পা ছড়িয়ে বসল ওর ফার্স্ট এসি কম্পার্টমেন্টের লোয়ার বার্থের ওপর। ট্রেন ছাড়তে এখনও মিনিট কুড়ি দেরি। পরনে এখনও ধরাচুড়ো। স্যুট পরেছিল আজ বিকাশ। নতুন প্রোমশানের খবর আজ ওদের গ্লোবাল সি-এমডি মিষ্টার ওয়াটসন তাজ করমন্ডলের ব্যাঙ্কয়েট হলে স্বয়ং দিলেন। সেই কবে এক সেলসম্যানের চাকরী নিয়ে জীবন শুরু করেছিল বিকাশ! গোদা বাংলায় বেচুবাবু। আজ আর ভাল করে মনেও পড়েনা। বিকাশের বয়স এখন চল্লিশের গোড়ার দিকে। চির অচেনা এক তীব্রতার সাথে ছুটে চলেছে বিকাশ! কেন? নিজের মনেই হাসে। মনে মনে ভাবে একবার কুমীরের পিঠে চড়লে নামা খুব শক্ত। কিন্তু কুমীরের পিঠের ওপর বিকাশ চড়তে চায়নি। রোজ নতুন রণনীতি নিয়ে ভাব। নিজে ছোট, অপরকে ছোটাও। আবার ভাব। ভাবা থামিয়েছ কি তুমি শেষ! রোজ পায়ের তলার জমিটাকে আরও শক্ত কর। তার পরেও পড়ে গিয়ে উঠে পড়ার জন্য তৈরী থাক। ওর ভাল লাগতো না এই দৌড় কিন্তু এখন দৌড়টা প্রায় জৈবিক অভ্যাসের মত হয়ে গেছে।

 

১৯৯২ পর্যন্ত মালটিন্যাশনাল কোম্পানী পি এন্ড জি’র পূর্ব ভারতের প্রধান হয়ে বেশ ভালই ছিল। এই অবধি উঠে আসার পথে অনেক পরিশ্রম করেছে অনেক প্রতিযোগিতার মুখোমুখি হয়েছে বিকাশ। তাই ভেবেছিল বাকি জীবনটা ডালে-দুধে-ভাতে কাটিয়ে দেবে। তা হয়নি।


পি এন্ড জি। সারা পৃথিবী জোড়া নাম ওদের কোম্পানীর। এই কোম্পানীতেই একদিন শুরু করেছিল প্রায় কুড়ি বছর আগে। মনে আছে গৌহাটির পানবাজারের রাস্তায় দাঁড়িয়ে গান - ভিক্স কি গোলি লো খিঁচ খিঁচ দূর করো - গেয়ে ট্রেনিং শুরু। তার পর থেকে বিকাশ বেচে চলেছে। তাই কি? তার আগেও কি বেচতে হতনা? রোজই তো ঘরে বাইরে কিছু না কিছু বেচতে হয়, সবাইকেই। বেচা বন্ধ হলে তো জীবন থেমে যাবে! সে নিজে কত সৎ, না চাইলেও সেই অরাকেও বেচতে হয়। কিছু না বলেও তো বেচা যায়।

১২ বছরের ওপর হলো, নিজেকে আরও বাড়িয়ে নিয়ে, আরও উন্নতি করার নেশা ওকে পেয়ে বসেছে। এই নেশার শুরু ১৯৯২ এর ২৯শে জানুয়ারীর রাত থেকে। তার তিন দিন আগে ২৬শে জানুয়ারী’র রাতে বিকাশের জীবনের ট্রেন ডিরেইলড হয়ে গিয়েছিল। দীপা ওর কাছে ডিভোর্স চেয়েছিল সে’রাতে। কারণ? ঠিক কি কারণ ছিল সেটা ওর কাছে আজও পরিষ্কার নয়। তবে সেটা নিয়ে আজ আর বিকাশ ভাবতে চায়না। আজও দীপা আছে। আজও সে ওর স্ত্রী। বিকাশ যেন মাঝ সমুদ্রে ঝড়ের মুখে পড়েছিল। দীপা হঠাৎই একটা লম্বা অভিযোগের ফর্দ পেশ করেছিল - ‘তুমি কেমন স্থানু হয়ে গেছ। তোমাকে নিয়ে আমার কোনও অহঙ্কার নেই। তুমি কেমন যেন অল্পেতে সন্তুষ্ট টাইপ'। বিকাশ কিছু বলতে যাচ্ছিল। পারল না। মাঝে মাঝে দীপা যখন বলে তখন সবাই শোনে। মানে বলার কোনও উপায় থাকেনা। বিকাশ খুব ভদ্র। এই জায়গাটা শুরু থেকেই
দীপাকে ছেড়ে দিয়ে রেখেছে। কিন্তু প্রয়োজনে বিকাশ যে কি কঠোর ভাবে কথা বলতে পারে সেটা দীপা জানে! তবু দীপা বলেই চলে - ‘তুমি না গড়েছ নিজের ক্যারিয়ার না আমাকে গড়তে দিয়েছ আমার ক্যারিয়ার। আমরা বরং আলাদা হয়ে গিয়ে নিজেদের দায়িত্ব নিয়ে নিই। পড়াশোনাটাও করনি ঠিক করে যে জীবনে আরও ওপরে উঠবে! শুধু বি এ পাশ করে কি আর এর বেশি যাওয়া যায় বিকাশ? তুমি পারবেনা। তুমি হারছ, হেরে চলেছ আর আমাকেও তোমার পরাজয়ের ভাগীদার বানিয়েছ‘! তার পর আর কোনও কথা শোনার জন্যে দীপা দাঁড়ায়নি। বিচারের বাণী শুনিয়ে স্বাভাবিক কাজে ফিরে গিয়েছিল দীপা। আর বাকহীন বিকাশের তিনটে দিন কোথা দিয়ে বয়ে চলে গিয়েছিল তা এখনও বোধের বাইরে। বিকাশ হতভম্ব! এ'রকম ফ্রেঞ্জি দীপাকে আগেও কখনও দেখেনি বিকাশ। এই প্রসঙ্গে মানে ওদের কেরিয়ার প্রগ্রেস নিয়ে আগেও কথা হয়েছে কিন্তু তার থেকে ডিভোর্স! তা ছাড়া বিকাশ উন্নতি যে করেনি তা’তো নয়। এটা ঠিক যে বিকাশ গত বছর আরেকটা প্রোমোশান রিফিউস করেছিল। কারণ ও কলকাতা ছেড়ে যেতে চায়নি। ঘরেই থাকতে চেয়েছিল। মাসে অন্ততঃ পনেরো দিন রাতে নিজের বাড়িতে ঘুমোতে চায় বিকাশ। কেরিয়ারের জন্য সব ছেড়ে দিয়ে বাইরে পড়ে থাকাটা বিকাশের খুবই অপছন্দ ছিল।। কিন্তু বিকাশ বুঝতে পারছিল, ওদের বিয়ের আট বছর পরেও, দীপার মায়ের ইচ্ছা পূরণের গল্প লেখা আজও শেষ হয়নি। যাদবপুরের স্কলার ইলেক্ট্রনিক্স এঞ্জিনিয়ার মেয়ের স্বামী কিনা বিএ পাশ এক বেচু! যদিও বিকাশ তখন কর্পোরেট সিঁড়ির বেশ ওপরে উঠে এসেছে। দীপার মা চাইতেন মেয়ের বিয়ে হবে কোনও বড় ডাক্তারের সাথে। সেদিনও ভাবতেন তিনি আবার মেয়ের বিয়ে দেবেন! দীপা প্রথম প্রথম মা'র এই সব ভাবনাকে আমল দিতনা। কিন্তু মাঝে মাঝে মায়ের কথার প্রচ্ছন্ন সমর্থন করে বসত আবার তার পরে এসে বিকাশের সাথে প্যাচ আপ করে নিত ওর মিষ্টি হাসি আর আগুন ধরানো চুমু দিয়ে। বিকাশ সেই আগুনে পুড়ে দীপাকে পৌঁছে দিত চূড়ান্ত সুখসীমায় বা তারও বাইরে।


জীবনের গাড়ী চলছিল বেশ। ঝগড়া ছাড়াই দাম্পত্য সুখ। দুজনে মিলে যেত একসাথে সুখবৃষ্টিতে ভিজে। দীপা বলত - ডাকাত একটা। ওদের মধ্যে একটা কেমিস্ট্রী আছে। দীপা যে ঠিক এই জায়গায় চলে যাবে সেটা বিকাশ বোঝেনি। ওর কল্পনার বাইরে দীপা ওকে এত বড় ধাক্কা দিতে পারল? বিকাশ ভেবে চলে। দীপা অন্য কারও প্রেমে পড়েছে বলেও মানতে রাজী নয় বিকাশ। সারাদিন দীপার ঘরের দিকেই মন। অফিসেও দীপা কোনও বাড়তি সময় দেয়না। দীপা পুরোপুরি ঘরোয়া এক কেরিয়ার উওম্যান। দীপা কেন এমন করছে!
বড় যন্ত্রণায় ছিল বিকাশ সেই তিন দিন তিন রাত। বিকাশ মনে মনে ঠিক করে ফেলল। দীপাকে আর কোনও কথা বলবেনা। বিকাশ দীপাকে একটু বেশীই ভালবাসে। সেই ভালবাসা একমুখী। কিন্তু সেই ভালবাসা বিকাশের মেরুদন্ডহীনতার প্রকাশ নয়। বিকাশ নিজেই নিজের জীবনটা তৈরী করেছে। নিজেকে গড়েছে, ভেঙ্গেছে আবার গড়েছে। দীপার এই পাগলামীকে বিকাশ আর প্রশ্রয় দেবেনা। দীপা জানে যে বিকাশ ওর আলুথালু ভাবনার স্প্রিং বোর্ড। সেটা এর আগেও বেশ কয়েক বার দীপা প্রমাণ দিয়েছে। দীপা যে কেন মাঝে মাঝে সব গুলিয়ে ফেলে বিকাশ সেটা বোঝার চেষ্টা করে এসেছে এতদিন। বিকাশ ঘুরে দাঁড়িয়েছিল ২৯শে জানুয়ারীর বিকেলে। দীপার এই সারমনাইজেশনকে পাত্তা দেওয়া একদম বন্ধ করে দেবে বলে ঠিক করেছিল বিকাশ।


২৯ তারিখ বিকেলে দীপার মা এসে সান্ত্বনা দিতে চেষ্টা করেছিলেন এমন ভাবে যেন কিছুই জানেন না। বিকাশ খুব রেগে গিয়েছিল। অদ্ভুত ঠান্ডা গলায় বলে ছিল - দেখুন এটা আমাদের স্বামী স্ত্রীর ব্যাপার, আপনি এর মধ্যে না এলেই ভাল হয়। আর যদি পেছনে মতামত দেন সেটা যেন আমার কানে না আসে। হয় মেয়ের আবার বিয়ে দেবার স্বপ্ন দেখা ছাড়ুন আর নয়ত কাগজ পত্র তৈরী করে নিয়ে আসুন সই করে দেব; কিন্তু কোনও নাটক করার চেষ্টা করবেন না। এই কথাগুলোকে অনুরোধ বা ঔদ্ধত্য বা দুইই মনে করতে পারেন। জীবনে কাউকে এভাবে অপমান করেনি বিকাশ এর আগে। আজ করল এবং বেশ সচেতন ভাবেই। বিকাশ শিখেছে কি করে রাগকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করতে হয় আর কি করে রাগের স্বীকার হওয়ার হাত থেকে নিজেকে রক্ষা করতে হয়। আগে প্রায়ই রেগে যেত বিকাশ। আজ সে শান্ত থেকেই রাগকে ব্যবহার করল। বিকাশের মনে হল যেন ওর আরেক উত্তরণ ঘটল।


২৯ তারিখ রাতে ফোন এল মুম্বাই থেকে। এইচ আর ডির হেড ডিস্যুজার ফোন। ন্যাশনাল সেলস ম্যানেজারের পোস্টের জন্যে প্রস্পেক্টিভ ডিস্কাশন আছে। তাজ বেঙ্গলে। আজকাল আর ইন্টারভিউ বলেনা - বলে প্রস্পেক্টিভ ডিস্কাশন।

সময় সকাল দশটা, ৩০শে জানুয়ারি ১৯৯২।


ডিরেক্টর, সাউথ এশিয়া মিষ্টার ওয়াটসন নিজে আসছেন সঙ্গে প্রেসিডেন্ট - ডমেস্টিক মার্কেটিং, মিষ্টার জে কুমার। তিরিশ তারিখ সকাল থেকেই যাবে কি যাবে না ঠিক করে উঠতে পারছিল না বিকাশ। কিন্তু সকালে বাথরুমে দীপার কথাগুলো ঝন ঝন করে বেজে উঠল আবার মনের মধ্যে - ‘তুমি কেমন স্থানু হয়ে গেছ। তোমাকে নিয়ে আমার কোনও অহঙ্কার নেই। তুমি কেমন যেন অল্পেতে সন্তুষ্ট টাইপ - তুমি না গড়েছ নিজের ক্যারিয়ার না আমাকে গড়তে দিয়েছ আমার ক্যারিয়ার - - - তুমি পারবেনা। তুমি হারছ, হেরে চলেছ বিকাশ আর আমাকেও তোমার পরাজয়ের সাথী করে নিয়েছ‘। বিকাশ বিড় বিড় করে বলল - দীপা আর নয় অনেক হয়েছে তোমার গেম অব হুইমস!


এই ক’দিন দীপার সাথে দু এক বার কথা বলতে চেয়েছে বিকাশ। না ফেরানোর জন্যে নয়, ওদের সম্পর্কের অস্বচ্ছ ছবিটা পরিষ্কার করার জন্যে। বিকাশ কনফিউশন নিয়ে চলতে পারেনা। কথা বলতে গিয়ে দেখেছে দীপা কেমন যেন একগুঁয়ে হয়ে যাচ্ছে। দীপা কিন্তু খুব নিশ্চিত নয় কেন এই আচমকা সিদ্ধান্ত সে নিয়েছে। কখনও মায়ের কথা বলে বা কখনও খড়দহের গগনদার কথা বলে আবার কখনও নিজের অভিজ্ঞতার কথা বলে। তবে সম্পূর্ণ মায়ের ইন্ধনে ও এই সিদ্ধান্ত নিয়েছে সেটাও দীপা মেনে নিতে চায়না। এদিকে নিজেকে পরাজিত বলে মেনে নিতে পারছেনা বিকাশ। দীপা এরকম কেন করছে! ওর অনুযোগের শুরু ও শেষ খুঁজতে গিয়ে বিকাশের মাথাটা তালগোল পাকিয়ে যায়। কিন্তু বিকাশ স্থির করেছে যে ওর ভালবাসাকে ও দীপার খামখেয়ালীপনার খেলনা হতে দেবেনা। স্নান করে বেরোবার মধ্যেই সিদ্ধান্ত নিল যে ও যাবে তাজ বেঙ্গলে। দেখা যাক এর পরের কুমীরের পিঠটা কতটা কাঁটাময়।


বিকেলে বাড়ি ফিরল। বিকাশ আবার প্রোমোটেড। মনের ভেতরে জেতার আনন্দ আর ঘরের মধ্যে অনিশ্চিত নিস্তব্ধতার মধ্যে বিকাশ স্যুটকেস গোছাতে লাগল। দীপা অফিস থেকে ফিরে দেখল যে বিকাশ প্যাকিং করছে - কিছু বললনা। দীপা সফটওয়ার য়্যানালিস্ট। সলটলেকের উইপ্রোতে আছে আজ চার বছর হল। দীপার উদাসীন আচরণ দেখে বিকাশের মনে হলো বিকাশ যে অবশেষে বাড়ী ছাড়ছে এটা দীপার কাছে যেন এক স্বস্তি। কারণ দীপা বিকাশের যুক্তির সামনে অসহজ পড়ছে এটা দীপা জানে। বিকাশ তবুও ভেবেছিল যে দীপা একবার এসে জানতে চাইবে সে কোথায় যাচ্ছে? দীপা চুপ। বেশ। বিকাশ ও চুপ। এর মাঝে পড়ে গিয়েছে ওদের একমাত্র সন্তান তাতুন। সে রাত্রে বিকাশ ছেলেকে নিয়ে অন্য ঘরে শুয়ে শুয়ে বোঝাল যে ওকে কাজের জন্যে মুম্বাই চলে যেতে হচ্ছে। ও রোজ ফোন করবে। ছেলে তাতুন যেন বুঝল। কিন্তু বিকাশ জানে যে তাতুন কি রকম কষ্ট পাচ্ছে ভেতরে ভেতরে। পরের দিন সকালে ফ্লাইটে বিকাশ মুম্বাই চলে গেল। ভোর বেলা যাবার সময় ছেলেকে বলে গেল।


মুম্বাইতে এসে বিকাশ জেদের বশে এক ধূমকেতুর মত কাজ করে যাচ্ছে ! ভালই করছে। লোক্যাল বা গ্লোব্যল বসেরা সবাই খুশি। তাতুনের সাথে মাঝে মাঝে ফোনে কথা হয়। ফোনটা রাখার পরেই শুরু হয় একটা যন্ত্রণা। ছেলের কাছে নিজেকে দোষী বলে মনে হয়। ছেলের সাথে খেলত ও রোজ বিকেলে। এখন ওর চার বছরের ছেলেটা বাবাকে খুব মিস করে। বলে - বাবা তুমি আমার সাথে খেলতে আসবেনা - তুমি তো আগে রোজ আমার সাথে খেলতে! ভেতরটা জ্বলে পুড়ে খাঁক হয়ে যায়। দীপা সব জানে। কিন্তু কোনও উল্লেখ মাত্র নেই। নয় মাসের মধ্যে বিকাশের ভাল কাজের আরেক পুরস্কার মিলল। সে মিষ্টার কুমারের জায়গায় প্রমোশান পেল। মার্কেটিং ডিরেক্টর। কুমারকে কমার্শিয়ালের হেড করে দেওয়া হয়েছে। এর পর বিকাশ আর পেছনে তাকায়নি। এর মধ্যে ল্যাটিন আমেরিকার প্রধান হয়ে ব্রাজিলে থেকে কাজ করে এসেছে প্রায় চার বছর। একা। তার পর রাশিয়া ও সি আই এস কান্ট্রিগুলোর হেড হয়ে দু’বছর মস্কোতে। দীপার একটা সাদা কালো ছবি পুরোন পার্সের মধ্যে আজও আছে। কিন্তু একবারের জন্যেও দীপার ছবিটা কে খুলে দেখেনি বিকাশ।

দীপা ফিরে এসেছিল বিকাশের কাছে ও ব্রাজিল থেকে ফিরে আসার পরেই। দীপা কেন ফিরে এসেছিল? ছেলের জন্যে না বিকাশের উন্নতি দেখে না বিকাশ যে হেরে যায়নি এটা দেখে? দীপা ভুল করেছিল এটা সে স্বীকার করতে দ্বিধা করেনি একটুও। পুনর্মিলনের প্রথম রাতটা ওরা দুজনে ওদের ওরলি সি ফেসের ফ্ল্যাটের ব্যালকনিতে বসে কথা বলেছিল অনেক রাত পর্যন্ত। দীপা স্বীকার করেছিল, বিকাশ যখন ট্যুরে যেত তখন ও মায়ের কাছে এসে থাকত আর মায়ের কথার প্রভাব ওকে ওই রকম খামখেয়ালী সিদ্ধান্ত নিতে সাহায্য করেছিল। দীপা কি অনাঘ্রাতা কিশোরী! দীপা কথা বলতে বলতে আছড়ে ভেঙ্গে পরেছিল বিকাশের শালপ্রাংশু বুকের ওপর। বিকাশ মেনে নিয়েছিল সব কারণ দীপা আর যাই হোক ওর ভেতরে কোনও পাঁক নেই। এটা বিকাশ বিশ্বাস করে আজও। বিকাশ দীপাকে বলেছিল এরকম আর করোনা দীপা। আমিও মানুষ। এস আমরা আবার শুরু করি। বিকাশ ওর মনের দরজা জানালা খুলে রেখেছিল। বিকাশ দীপা কে হারাতে চায়নি। দীপাও একাই কাটিয়েছে ছেলে আর বাবা মা’কে নিয়ে এই ক’টা বছর। তাই যখন দীপা ফিরে এসে বিকাশের কাছে আর ওর ভুল স্বীকার করল তখন কিন্তু এক মুহূর্তও লাগেনি বিকাশের দীপাকে কাছে টেনে নিতে।

 

ফিরে আসাটাও অদ্ভুত। হঠাৎ রাত সাড়ে নটার সময় ডোর বেল বাজল। বিকাশ দরজা খুলে দেখে সপুত্র দীপা দাঁড়িয়ে হাসছে মুখ টিপে, হাতে একটা ওভারনাঈটার স্যুটকেস। ট্যাক্সিতে সোজা এয়ারপোর্ট থেকে। দুজনে নীরবে দুজনের দিকে তাকিয়ে থেকেই কাটিয়ে দিল। তাতুন সেই নীরবতা ভাঙ্গল। মা ভেতরে এস! বাবা খুব ক্ষিদে পেয়েছে। ভেতরে আসার পর দীপা সোজা চলে গেল ব্যালকনিতে। তাতুন খুব ক্লান্ত ছিল। খেয়েদেয়ে টিভি দেখতে দেখতে ঘুমিয়ে পড়ল। সব কিছু এখন বেশ শান্তিপূর্ণ। তবু একটা কথা আজও খোঁচায় বিকাশকে। দীপা কি ওর সাফল্যকে ভালবাসে? নাকি ওকে? দীপা তো জেনেশুনেই এই বেচু কে বন্ধু ও স্বামী হিসেবে গ্রহন করেছিল। তাহলে? বিকাশের পদন্নোতি ওর কঠিন পরিশ্রম ও বুদ্ধিদীপ্ত কাজের ফল। আজ কি দীপা ওকে নিয়ে সুখী? তবে বিকাশ জানে এসব ভেবে কোনও লাভ নেই। ছেলে এখন ক্লাস ইলেভেনে পড়ে। দীপা এখন আরও সুন্দর হয়েছে। বয়সের সাথে সাথে ও যেন আরও সুন্দর হয়ে উঠছে।


ব্যাঙ্গালোর এক্সপ্রেস ট্রেনটা বেশ জোরে ছুটে চলেছে। সকাল থেকে খবরের কাগজে চোখ বোলাবার সময় পায়নি। ওয়াটসন গ্লোবাল সিইও হয়ে চলে যাচ্ছেন আমেরিকায় আর সাউথ এশিয়ার দায়িত্ব বিকাশকে দিয়ে যাচ্ছেন। বিকাশ চেন্নাইতে আছে শুনে সোজা এসে নেমেছেন আজ সকালে। কাগজ পড়ার ফাঁকে ছেলেকে একটা এস এম এস করল - হাই! ওই টুকুই কিন্তু বাবা ছেলেতে একট বন্ধুত্ব আছে। সারা দিন ফেলিসিটেশন, য়্যাওয়ার্ড সেরিমনি, মিটিং, ক্লোজ ডোর স্টর্মিং, মিডিয়া ব্রিফিং সব সেরে বিকাশ ট্রেন ধরেছে কারণ ওর ব্যঙ্গালোরের ফ্লাইটের সময় পেরিয়ে গিয়েছিল। আজ অনেকদিন পরে বিকাশ ট্রেনে চড়েছে। সখ করে নয়। ট্রেনে চড়ে লম্বা জার্নি করে কোথাও কাজে গেলে ওর মনে হয় ওকে আলসেমি চেপে ধরছে। কাজে কোনও গতি নেই। জীবনে প্রথম ফ্লাইট মিস করল বিকাশ! একটু অস্বস্তি হচ্ছিল বিকাশের কারণ নিজের ওয়ার্ক ডিসিপ্লিন নিয়ে ও খুব পিটপিটে চিরকাল। ভাগ্যিস চেন্নাই লোক্যাল অফিস এই ষ্ট্যান্ড বাই টিকিটটা কেটে রেখেছিল। কাল সকালের প্রেস ব্রিফিংটা য়্যাটেন্ড করতে পারবে ব্যঙ্গালোরে। তার পর সন্ধ্যেবেলায় দিল্লি। ধূমকেতুর মত গতি ও অবস্থিতি বিকাশের। পরের দিন সকালে আবার কলকাতায়।


ট্রেন ছুটছে। সঙ্গত করা দুলকি চালে হেলানো শরীরটাকে তুলে কাগজটা পাশে রেখে চশমাটা চোখ থেকে নামাল বিকাশ। বেশ জোরে একটা হাই তুলতেই বিকাশের হা আটকে গেল সামনের লোয়ার বার্থে এক অনাবিল সুন্দরী মহিলাকে দেখে। বেশ হৃদয়ে তুফান তোলা চেহারা। বেশ শৈল্পিক মাপে ভগবান তৈরী করেছেন। সর্বত্র সব উপাদান যথাযথ। আবৃত ও অনাবৃত সর্বত্রই উনি বেশ আকর্ষিকা ও মোহিনী। চোখ ফেরাতে বেশ একটু সময় লাগল বিকাশের। কিন্তু বিকাশের তাতে কি আসে যায়! রাতটুকু কাটলেই ভোর পাঁচটায় ব্যঙ্গালোর। এখন প্রায় রাত এগারোটা। ওপরের বার্থে দু'জন শুয়ে আছেন যাদের মুখ বিকাশ ভাল করে দেখেওনি, দুজনেই নাক ডাকার প্রতিযোগীতায় নেমেছেন। তারই মাঝে এক অস্বচ্ছ নীরবতা। সেই ঘোলাটে নীরবতা প্রথম ভাঙ্গলেন সুন্দরী মহিলাই। কথপোকথন ইংরেজীতেই। বেশ রোমান্টিক হাস্কি গলায় - মাফ করবেন আপনি কিন্তু খুব শান্ত। বিকাশ কি করবে আর না করবে তা না বুঝেই জিজ্ঞাসা করল আমাকে বলছেন? মহিলা খুব রসিক, বললেন না আমি এই ছড়ানো খবরের কাগজটাকে বলছি, বলেই খিল খিল করে হেসে উঠে বললেন আমি উমা মহাদেবন।
- আপনি?

বিকাশ তাড়াতাড়ি স্বাভাবিক করে নেয় নিজেকে - হেসে বলল - বিকাশ গুপ্ত। আমি বাঙ্গালী। কথাটা বলতেই বিকাশের চোখে মুখে এক দীপ্তভাব দেখতে পেল উমা। উমা আবার হেসে উঠে বলল - ইউ আর আ স্মার্ট গাই এন্ড আ প্রাউড বং। বিকাশ ভাবছে মহিলা খুব স্মার্ট।


উমা ঠিক কোন প্রদেশের সেটা না বলে দিলে বোঝা যায়না। পুরোপুরি কস্মোপলিটান সেলিব্রিটি লুক। তার সাথে এক দুর্বার ও দুর্বিনীত যৌন আবেদনের সৌদামিনি প্রকাশ। উমাকে মনে হলো কিউপিডের অর্ধাঙ্গিনী সাইকের মত। আমাকে উপেক্ষা করে দেখতো পার কিনা - এই রকম একটা নীরব আবেদন। বিকাশ নির্বিকার। ট্রেন ছুটে চলেছে। থামছে আবার চলছে। কথা বলতে বলতে ওরা দুজনে বুঝল আজ রাতে ঘুম হবার নয়। নাক ডাকার সিম্ফনি উদারা, মুদারা ছাড়িয়ে তারায় পৌঁছে আবার গভীর উদারায়। এরা দুজনে যেন সরগম পাঠ করে চলেছে। চরম প্রতিযোগীতা চলছে দুজনের মধ্যে। বিকাশ তবুও শোওয়ার জন্যে বেড শিটটা টেনে পাতল। বালিশটা গুছিয়ে মাথার দিকে রাখতে যাবে, তক্ষুনি ট্রেনটা এক লহমায় হঠাৎ একদম নিশ্চল -থেমে গেল। আর উমা তার নরম শরীরটাকে আয়ত্তে রাখতে না পেরে বিকাশের গায়ে এসে লেÌেট পড়ল। কয়েক মুহূর্তের অসাড়তা। বিকাশ বাকরুদ্ধ। উমা নিজেকে সংযত করে নিতে নিতে সরি বলে বসে পড়ল। বিকাশের পক্ষে এ’এক নতুন অভিজ্ঞতা। উমার কাছে কিনা তা বিকাশ জানেনা।


স্বাভাবিক হোতে আরও কিছু সময় গেল। চেন পুল করেছিল কেউ। কি কারণে? সেটা জানার কারও মধ্যে বিন্দুমাত্র আগ্রহও নেই। বিকাশ টি টি ই কে জিজ্ঞাসা করেছিল। উমা খুব আদুরে গলায় বলল - মিষ্টার গুপ্তা, জাস্ট লিভ ইট। ইট ডাজন’ট ওয়ার্থ ইওর এফর্ট। বিকাশ নিমরাজী হয়ে বসে পড়ল। টি টি ই যেন শুনতে পায়নি এমন ভাবে চলে গেল।
 

ট্রেন আবার চলতে শুরু করল। দুজনে সব রকম বিষয় নিয়ে কথা বলছে। উমা কখনও সখনও ড্রিঙ্ক করে কিন্তু স্মোকার্সদের পছন্দ করেনা। উমা মাঝে মাঝেই বিকাশকে কম্পলিমেন্ট দিচ্ছে বিভিন্ন বিষয়ের ওপর তার দখল দেখে আর বিকাশ প্রত্যুত্তরে ধন্যবাদ দিচ্ছে আর খুঁজে খুঁজে উমার প্রতিভার প্রশংসা করে চলেছে সীমার মধ্যে থেকেই। উমার বয়স বোঝা মুস্কিল। বত্রিশ বা তেত্রিশ হবে। কিন্তু ওর ছেলে সুইৎজারল্যান্ডে হায়ার এডুকেশন নিচ্ছে। উমা নিজেই বলেছে। ওর প্রথম স্বামীকে ও ত্যাগ করেছিল কারণ সে খুব সাদামাটা ছিল। উমা চায় শালপ্রাংশু পুরুষ তার গণগনে শরীরের আঁচে পুড়ুক এক সীমাহীন ঝলসানো সুখে। উমা নিজে এক আগুনের লেলিহান শিখা। এটা উমা বেশ ভাল করেই জানে এবং বুঝিয়েও দেয়। অবশ্য ওর হবু স্বামী যে কিনা ইন্ডিয়ান এয়ার লাইনসের একজন ডিরেক্টর তার বয়স প্রায় পঞ্চান্ন। সে কথাও উমা গোপন করেনি। আর মাত্র এগার দিন পরে ওদের বিয়ে। উমার জীবনের ট্রেন কোন ধাতুর পাতের ওপর চলে! বিকাশ ভাবছিল। কিন্তু এই দুলকি চালের চলাটা বিকাশের ভালই লাগছে। চলা বিকাশের প্রিয়। থেমে থাকা ওর কাছে মৃত্যুর সমান। রবিবারে বাড়িতে বিকাশ হয় কার ওয়াশ করে, নয়তো রান্না করে নয়তো ড্রাইভে যায়।
 

বিকাশের ভদ্রতা এতক্ষণ ওকে ঠেকিয়ে রেখেছিল। উমা বার বার বলা সত্যেও বিকাশ উলটো দিকের বার্থে বসেই কথা বলছিল। কিন্তু উমার বড় স্যুটকেসটা সিটের নিচ থেকে টানার জন্য উমা বিকাশকে অনুরোধ করল। বিকাশ উঠে এসে ওকে সাহায্য করল। আর উমা তখনই ওর হাত ধরে টেনে বসিয়ে দিল তার পাশে, খুব কাছে, একেবারে ওর গা ঘেঁষে - নীরবে দু চোখের স্রোতস্বীনি চাহুনি দিয়ে বলল - এসো এসো এসো আমার কাছে এসো - আমি তোমায় খেয়ে ফেললেও তোমার ভালই লাগবে। উমার টসটসে ঠোঁটদুটো কথা বলে! বিকাশ ভাবলেশহীন। উমা ওর নরম হাতের তালুতে বিকাশের হাতটা নিয়ে জানতে চাইল, ও পামিস্ট্রিতে বিশ্বাস করে কিনা! উত্তরের অপেক্ষায় না থেকে উমা বিকাশের ডান হাতটা ওর নরম হাতের মধ্যে নিয়ে নিল। বিকাশ তার সম্পর্কে উমার ভবিষ্যত বাণী শুনছিল কিন্তু ওর ছোঁয়া বিকাশকে বলে দিচ্ছিল যে উমা বিকাশকে ওর শরীরটাকে মস্টাতে বলছে। একসময় খুব অন্তরঙ্গ হয়ে উমা বিকাশের বাহুতে ওর উদ্ভিগ্ন, উদ্ধত যৌবনের প্রমান চেপে ধরল। উমার উষ্ণ স্তনবৃন্তের স্বেচ্ছা চাপে বিকাশ ক্রমশঃ শীতল হয়ে যাচ্ছে আর উমার ঘনিষ্ঠ হবার প্রবল চেষ্টা বেড়ে চলেছে। উমার শরীরি আবেদনের উত্তাপও ক্রমশঃ বাড়ছে। বিকাশের এই গায়ে পড়া সুন্দরীদের একদম ভাল লাগেনা। বিকাশ ওর হাতটা আলতো করে সরিয়ে নিল। বিকাশ উঠতে চেষ্টা করল। উমা ক্ষীন স্বরে বলল - প্লিজ বিকাশ!


উমা এডুকেশন ডট কম এর সিইও। বিরাট শিক্ষিতা মহিলা। কেম্বরিজের ট্রিনিটি কলেজের পোস্ট গ্র্যাজুয়েট। চেন্নাই ইউনিভার্সিটির পি এইচ ডি। ডক্টর উমা মহাদেবন। ইতিমধ্যে বিকাশ আরেকটু সহজ হয়েছে। উমা আরও সহজ। ওর ডিজাইনার সালোয়ার কামিজটা বেশ অগোছাল হয়েই আছে, তাতে যেন উমা আরও সহজ, দোপাট্টাটা পাশে পড়ে আছে। মাঝে মাঝে নিচেও পরে যাচ্ছে আর উমা নিচু হয়ে কুড়িয়ে তোলার সময় বিকাশকে একবার বাঁকা চোখে দেখে নিচ্ছে। বিকাশের চোখ এড়াচ্ছে না উমার উদ্ধত বুকের অহঙ্কারী প্রকাশ। যেন আরও বেশি করে দেখাতে চাইছে উমা তার লেলিহান ঔদ্ধত্য।

উমা বিকাশকে আরও সহজ বা বলা ভাল আরও তরল করার জন্য একস্ট্রা ম্যারাইটাল য়্যাফেয়ার্সের প্রসঙ্গটা নিজেই তুলে নিয়ে তার মতামত জানাল। জীবনটাকে উপোভোগ করার মধ্যে আরেক জীবন আছে। উমা বেশ জোরের সাথে ওর সেক্সুয়াল ওরিয়েন্টেশনের তত্ব বোঝাল বিকাশকে। পার্টনার চেঞ্জ করার খেলাটা কি করে খেলতে হয় সে ব্যাপারেও উমার সম্যক জ্ঞান ও বিকাশকে দিল উমা। এর পর বিকাশের মতামতের পালা। বিকাশ নিজেকে বেশ গুছিয়ে পেশ করল। বিকাশ উমার সঙ্গে একমত নয় এটা বেশ বুদ্ধিদীপ্ত ভাবে উমাকে বুঝিয়ে দিল। কিন্তু উমা যেন হেরে যাচ্ছে বিকাশের মানসিক স্থৈর্য্যের কাছে। উমার সাহস করে বলতে পারছেনা - আর ইউ ম্যান এনাফ? বিকাশ ততক্ষণে একটা দৃ• ব্যক্তিত্ব হয়ে প্রকাশিত উমার সামনে। আর উমা চাইছে বিকাশ বুঝে নিক যে উমা ওকে চাইছে আজ এই রাতে, এই চলন্ত ট্রেনের বার্থের বিছানায়। উমার কাছে বিকাশ হল শ্রেষ্ঠ পুরুষ সঙ্গের হাতছানি আর বিকাশ কোনও উৎসাহই দেখাচ্ছেনা। উমা কথাটা ঘুরিয়ে বলল - আই আন্ডারষ্ট্যান্ড কোয়ালিটী বিকাশ। ইউ আর আ গ্রেট গাই।
 

বিকাশের অনাসক্তি উমাকে রাগিয়ে তুলছে আর বিকাশের বিরক্তি বাড়ছে। দীপার মুখটা মনে পড়ছে আর সেটা ওর মতামতের মধ্যে জানিয়েছেও উমাকে। কিন্তু উমা কাঁচ পোকার মত বিকাশের কাছে আসতে চাইছে। এবার বিকাশের হাতটা নিজের হাতের মধ্যে নিল উমা। চকিতে হাতটা চেপে ধরল উমা ওর বুকের মাঝে আর বলল - আমি তোমাকে চাইতে শুরু করেছি বিকাশ। রাত তখন তিনটে। বিকাশ কুপে থেকে বেরিয়ে জানালার সামনে গিয়ে একটা সিগারেট ধরাল। ভাবল, এবার উমা নিজেকে গুটিয়ে নিক। ওর কাছে এই রাতের ট্রেন জার্নিটা এক বিভীষিকা। দীপাকে ফোন করতে গিয়ে ঘড়ির দিকে তাকিয়ে সেলটা পকেটেই রেখে দিল। উমা কখন পেছন থেকে এসে দাঁড়িয়ে বিকাশের পিঠে হাত রেখেছে বিকাশ বোঝেনি। বুঝল যখন উমার ম্যানিকিওর করা নখের আঁচড় অনুভব করল, সেই সঙ্গে উমার উষ্ণ ঠোঁটের ছোঁওয়া ওর বাহুতে। বিকাশ সিগারেটটা ফেলে দিয়ে বলল - উমা আমি এই একরাতের শরীর চাইনা। দয়া করে গিয়ে শুয়ে পড়ুন। উমা যেন পরাজিতা সিংহী! বলল, কেন? আমি কি এতই তুচ্ছ! বিকাশ বলল - না তা নয় আপনি ঠিক বুঝবেন না আমি কি বলতে চাইছি। তার পর ঝিঁ ঝিঁ ডাকা নিশ্চুপ এক ঘন্টা যেন শেষ হতে চায়না।
 

ট্রেন ব্যঙ্গালোর মেইন ষ্টেশনে ঢুকছে। বিকাশ গেটের কাছে দাঁড়িয়ে। পেছনে এসে উমা বলল আমি তাজ রেসিডেনসির স্যুটে থাকব। আজকের সব প্রোগ্রাম ক্যান্সেল করে দেব যদি তুমি আস। বিকাশ আলতো করে উমার হাতটা সরিয়ে নিল ওর কোমরের ওপর থেকে আর বলল আমি বন্ধু হতে পারলাম না কিন্তু আমি আপনার শত্রু নই। তাই আমাকে মাফ করতে হবেনা,ভাল থাকবেন। দিল্লির ফ্লাইটটা রাইট টাইমেই আছে। বিকাশ ফোন করে জেনে নিয়েছে। লাঞ্চের সময় তাজ ওয়েস্ট এন্ডের রেস্তোঁরাতে দেখল উমা একটি দারুণ সুপুরুষ যুবকের কণ্ঠলগ্না হয়ে বিয়ার পান করছে। উমা উঠেছে তাজ রেসিডেনসিতে আর লাঞ্চ করছে এখানে! বিকাশ ওর কৌতুহলকে একেবারেই আমল দিলনা। শুধু উপলব্ধি করল। বিকাশের পদস্খলন হয়নি। বিকাশ নিজেকে আবার আবিষ্কার করল। আজ ওর সম্পৃক্তি - নিজের সাথে নিজের।


মুম্বাই
নভেম্বর ১৭, ২০০৬