মনুষ্যত্ব


[এই ঘটনার সংখ্যা তত্বের দিকে পুঙ্খানুপুংখ ধ্যান না দিয়ে অন্তস্থ বক্তব্যটি বুঝলে লেখক পাঠকের কাছে কৃতঞ্জ থাকবেন।]
 

এই ধরণের ঘটনা রোজ ঘটে কিনা জানিনা! কিন্তু এমন সব ঘটনা ঘটে যা দেখে নিস্পৃহ থাকা যায়না অথচ আপন প্রাণের ও আপন সম্পর্কগুলোর স্বস্তিময় জীবনের লোভে চুপ করে থাকা ছাড়া মধ্যবিত্ত মন আর কোনও উপায়ও জানেনা। মনুষ্যত্ব কি সেখানে পরাজয় স্বীকার করে নেয় না? আজ স্মরণ করব সেই সব ঘটনার একটি যেখানে মনুষ্যত্ব ও পশুত্ব দুইই চরম নিদর্শন রেখে যায়! মনে হয় এক সাচ্চা মানুষের সাথে পরিচয় হবে পাঠকের, যিনি তাঁর প্রাণ দিয়ে বুঝিয়ে দিয়েছিলেন যে কর্তব্য হল আত্মার আদেশ – কোনও দপ্তরী অহঙ্কারের প্রতিপালন নয়।
২০০৪ এর ৩১শে ডিসেম্বর রাত একটার কিছু পরের কথা। কলকাতা শহরের রফি আহমেদ কিদোয়াই রোডের ওপর দিয়ে একটি হলদে রঙের ট্যাক্সি উন্মত্ত হয়ে ছুটে চলেছে। ট্যাক্সির যাত্রীরা কেউই সুস্থ বলে মনে হয়না। এমনকি তার ড্রাইভারও নয়। এদের মধ্যে কেউ কেউ ট্যাক্সির জানালা দিয়ে মুখ বার করে হায়নার মত ডাক ছাড়ছে – কেউ বা আবার ট্যাক্সির ড্রাইভারকে আদেশ দিয়ে চলেছে যে করেই হোক তাদের পাশে চলতে থাকা মোটর বাইকের যাত্রীদের ধরতেই হবে। এক মরণখেলায় মেতেছে মানুষরূপী এই দু’পেয়ে পুঙ্গবেরা। ঐ ট্যাক্সির পাশে বা একটু আগে একটি মটর বাইকে এক পুরুষ ও সুন্দরী মহিলা হয়ত নিউ ইয়ার সেলিব্রেট করে ঘরে ফিরছিলেন। ট্যাক্সির যাত্রীদের নজর গিয়ে পড়ল ঐ সুন্দরী মহিলার ওপর। ব্যাস, এদের তখন একটিই লক্ষ্য যে ভাবেই হোক ওই মহিলাকে তাদের কুক্ষিগত করতেই হবে! সেই রকমই ঈঙ্গিতময় বাক্যবাণ তারা ঐ মহিলার উদ্দেশ্যে ছুড়ে দিচ্ছিল। সেই ট্যাক্সির সব যাত্রীই ছিলেন কলকাতা পুলিশের বডিগার্ড লাইনের চার জন কনষ্টেবল জনসেবক।
উন্মত্ত গতিতে ছুটে চলা ট্যাক্সির কিছুটা পেছনেই আপন ভদ্রগতিতে আরেকটি সাদা রঙের মারূতী ৮০০ সেডানও আসছিল। আর পিছনের সেই মারূতী গাড়ির মধ্যে ছিলেন কলকাতা পূলিশেরই সার্জেন্ট বাপী সেন ও তার কিছু বন্ধুরা। তাঁরাও নিউ ইয়ার সেরে বাড়ি ফিরছিলেন। ট্যাক্সির মধ্যে তখন সেই হায়না বাহিনীর চিতকার মধ্যরাতের কলকাতার আকাশ চিড়ফাড় করে পুরুষকারের জয়জয়াকার জানাচ্ছিল। এরই মাঝে ঐ ট্যাক্সি মটর বাইকের খুব কাছে এসে পড়াতে ওদের হাত বাইকের পিছনে বসা মহিলার গায়ে বা তার পরিধেয় লাঞ্ছন করতে সক্ষম হচ্ছিল আর তার পরিণতিতে সেই মহিলার আত্মরক্ষার জন্য চীল চীতকার নিস্তব্ধ কলকাতার আকশকে জানান দিচ্ছিল কি নিরাপদ কলকাতা শহর!
ব্যাপারটা নজরে পড়তেই সার্জেন্ট বাপী সেন প্রমাদ গোনেন। তিনি তখন মারূতী গাড়ির চালক তার বন্ধুকে বলেন তাড়াতাড়ি ওদের কাছে পৌঁছে যেতে। সার্জেন্টকে তাঁর বন্ধুরা জানেন খুব একজন ন্যায়পরায়ন ও কর্তব্যে সমর্পিত পুলিশ অফিসার হিসেবে। মারূতী গাড়ী খুব দ্রুতই পৌঁছে যায় ট্যাক্সির সামনে এবং সেই ট্যাক্সিকে দাঁড়াতে বাধ্য করে। বাপী সেন গাড়ী থেকে নেমে এসে তাঁর পরিচয় দেন। এর পর? এর পরে যা ঘটে তা শব্দে বয়ান করা যায়না তবুও লিখছি। চ্চকিতে ট্যাক্সির মধ্যের উন্মত্ব হায়না বাহিনী বেরিয়ে আসে। তারা বিনা বাক্যালাপেই বাপী সেনকে ধাক্কা দিয়ে ফেলে মারতে শুরু করে। তিনি তখন তাঁর আই ডি কার্ড দেখাবার চেষ্টা করেন আর তাতে কি হল কে জানে ন্যায়পরায়ন সার্জেন্টের একান্ত একক প্রতিরোধ নিমেষেই নির্বল হয়ে পড়ল। বাপী সেনের বন্ধুরা দূরে দাঁড়িয়ে দেখছেন তাদের বন্ধুর নির্ম্মম ধোলাই হচ্ছে কিন্তু কেউই এগিয়ে আসেননি। প্রাণের ভয়ে? না কি মনুষ্যত্ব বলে কিছু ছিলনা তাদের? কে জানে! কলকাতা পুলিশের চারজন কনষ্টেবল কলকাতা পুলিশেরই এক উচ্চতন অফিসার সার্জেন্টকে বেধড়ক পেটাচ্ছে শহরের বুকের ওপর আর কেউ তার ধারে কাছে নেই একটু সাহায্য করার জন্য! ইতিমধ্যে ঐ শয়তান বাহিনী বাপী সেনকে রফি আহমেদ কিদোয়াই রোডের ট্রাম লাইনের ওপরে ফেলে ট্যাক্সির স্টার্টার স্পিন্ডল রড দিয়ে পেটাতে পেটাতে প্রায় নিস্তেজ করে ফেলেছে। বাপী সেন পড়ে আছেন নিস্তেজ হয়ে আর তারা ট্যাক্সিতে বসে আবার সেই উন্মত্ততার সাথেই উধাও হয়ে গেল। অনেকক্ষণ পরে বাপী সেনের বন্ধুদের সম্বিত ফেরার পরে তারা তাকে হাসপাতালে নিয়ে যান। তখন বাপী সেন সম্পুর্ণ অচৈতন্য। সরকারি পি জি হাসপাতালে নিয়ে গেলে সেখান থেকে জানান হয় তাদের কিছুই করার নেই। তার পর তাকে বিড়লাদের কোঠারি মেডিক্যাল সেন্টারে ভর্তি করা হয়।
এই ঘটনার পর পুলিশ মন্ত্রী এবং পশ্চিমবংগ সরকারের মুখ্যমন্ত্রী অর্থমন্ত্রী অসীম দাশগুপ্তকে দায়ীত্ব দেন চিকিতসার যেন কোনও ত্রুটি না হয় - সব কিছু যেন করা হয়। কিন্তু বাপী সেন তো তখন ভিন্ন জগতের বাসিন্দা হয়ে গেছেন। ডাক্তারেরা কিছুই করতে পারেননি। ঘটনার প্রভাব যাতে পুলিশ প্রশাসনের ওপর না পড়ে তার জন্যে প্রায় সাত দিন ধরে মিডিয়ার কাছে বলা হল বাপী সেন জীবিত আছেন। অবশেষে জানান হল বাপী সেন আর নেই। তাঁর স্ত্রী পুত্রকে দেওয়া সরকারের আশ্বাসবাণী কতটা সত্যি হয়েছে আমি জানিনা। কিন্তু এটা জানি যে মানবিকতা ও দায়ীত্বশীলতার সঙ্গে বাপী সেন – যিনি ঐ ঘটনার সময় ডিউটিতেও ছিলেননা – এক অজানা অচেনা মহিলাকে শ্লীলতাহানির হাত থেকে বাঁচালেন – নিজের প্রাণ দিলেন তার মুল্য কতখানি! তিনি কত মহান কাজ করে ছিলেন তা আজ আর কেউ জানতে চায় কি? কিন্তু বীরের ধর্ম্মতো এই রকমই – তাই না? আর সেই সঙ্গে এও জানতে ইচ্ছে করে সেই মহিলা এবং পুরুষটি বাইক নিয়ে সেই যে উধাও হলেন, তারা কি মানুষ? তাদের কি একবারও মনে হয়নি - তাদের কাছে কত মানুষ, পুলিশ, প্রশাসন ও শহীদ বাপী সেনের পরিবার আকুল আবেদন জানিয়েছিলেন সামনে আসার জন্য - কিন্তু তারা হয়ত নিজেদের ভুয়া নিরাপত্তার অজুহাতে আড়ালেই থেকে গেলেন। তারা কি একবার এসে সেন পরিবারের পাশে দাঁড়াতে পারতেন না? ইতিমধ্যে অবশ্য সেই খুনীদের ধরা হয়েছে এবং বিচার চলেছে – সাজাও হয়েছে। কিন্তু সাহসী ও কর্তব্যপরায়ণ পুলিশ অফিসারদের সংখ্যা কমে যাবার যথেষ্ট কারণও কি তৈরী হয়নি? পুলিশ মানুষের পাশে দাঁড়াক, মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করুক এটাই সবাই চায় – কিন্তু পুলিশও যে মানুষ তার নীরব মনুষ্যত্বের দাম কে দেবে? পুলিশ যারা হয় তারা আমাদের মতই মধ্যবিত্ত পরিবার থেকেই আসে। বাপী সেনের সাত বছরের ছেলে কি বুঝেছিল সেদিন যে তার বাবা কত বড় কাজ করে গেলেন? কেন তার বাবা আর ঘরে ফেরেননি? কেন তাঁর মায়ের সামাজিক অবস্থান রাতারাতি বৈধব্যে পরিণত হল? সে কি জানে বৈধব্য কি? কিন্তু কাদের জন্যে? বাপী সেনের কি কোনও আইনগত দায় ছিল সেদিন ঐ মহিলার শ্লীলতা রক্ষা করার? তিনি তো সেদিন ডিউটিতেই ছিলেন না। কত প্রশ্ন আছে যার কোনও উত্তর নেই। কি অসহায় আমরা – তাই না? যারা বীর সার্জন্ট বাপী সেনের জীবন নিল এবং তাঁর পরিবারকে অনিশ্চয়তার দিকে ঠেলে দিল তারা কি মানুষের ঔরসে বা কোনও মানবী মাতৃগর্ভে জন্ম নিয়েছিল? মনুষ্যত্বের এতবড় লাঞ্ছনার নজির আর কারও জানা আছে কি! কিম্বা মনুষ্যত্বের এত বড় উদাহরণের কথা? সুখের কথা এই যে ক্রমঃবর্দ্ধমান সিনিসিজমের দাস হতে থাকা আমাদের সমাজে কেউ বাপী সেনের এই আত্মত্যাগকে ব্যাংগ করে শহীদ ক্ষুদিরাম বলে চিহ্নিত করেনি। মানুষের ভাল দিকটা এখনও ভারী – তাই বুঝি পৃথিবী চলেছে। আশা রাখি আরেকজন বাপী সেন কে জীবন দিয়ে বোঝাতে হবেনা মনুষ্যত্বের মাহাত্ম। বীর বাপী সেন তোমাকে লক্ষকোটী প্রণাম জানাই...


অনাম্নী স্বাক্ষর
অগাস্ট ২৫, ২০০৮