প্রাঞ্জলের নতুন ভোর

সাহারা তুষার

 

রাতের মৌনতা যেন লাঙ্গলে চেরা মাটির মত খণ্ড খণ্ড করে দেয় বুকের জমিন। নির্জনতার অভিশাপ অক্টোপাশের মত টিপে ধরে গলা। তখন পৃথিবীকে মনে হয় পিচ কালো করব। নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে আসে অক্সিজেনের অভাবে। কেঁপে ওঠে স্বপ্নের পৃথিবী ভূমিকম্পে দুঃস্বপ্নে আবাহনে। তারপরও রক্তাক্ত পায়ে এগোতে হয বন্ধুর পথ। নামে মাত্র বেঁচে থাকার জন্যে। সবকিছু হারিয়ে নিঃস্ব হয়েও মানুষ কেন বেঁচে থাকার দুর্দমণীয় আকাঙ্ক্ষ ত্যাগ করতে পারে না, তা কিছুতেই মাথায় আসে না প্রাঞ্জলের। পৃথিবীর সাথে মানুষের এই যে টান তার ব্যতিক্রম নয় প্রাঞ্জলও। সে-ও গ্রহ-উপগ্রহের মত নিরন্তর ঘুরছে নিজ কক্ষপথে। অনেকবার অপেক্ষাহীন মৃত্যুকে নীরবে গ্রহণ করতে গিয়েও বাঁধা পেয়েছে বিবেকের কাছে। বাঁধা সৃষ্টি করা মানুষগুলোর চাওয়া-পাওয়া, হাসি-আনন্দ তাকে ঘিরে। নিজেকে নিজে বঞ্চিত করলেও উপেক্ষা করতে পারেনি পরিবারের সদ্যসদের। নিষ্পাপ বোনের ভাইয়া ডাক, মায়ের খোকা বলে বাহুবন্ধনের অকৃত্রিম স্নেহ, বাবার শাসনমাখা ভালবাসা দুহাতে সরিয়ে দিয়ে স্বাদ নিতে পরিনি কঠিন শীতল মৃত্যুর। সময় অসময় ভিড় করে প্রীতির মুখ। অস্পষ্ট থেকে আস্তে আস্তে স্পষ্ট হয়ে ওঠে ওর নাক, কান, গলা, হাসি, হাঁটার ঢঙ, কথা বলার ছন্দ, বেনী দোলানো। তখন স্মৃতি-স্মৃতি থাকে না, হয়ে যায় রাত-দিনের মত বাস্তব। ছুঁয়ে দেখা যায় তখন তাকে। ত্বকের ঘ্রাণ নেওয়া যায় চোখ বন্ধ করে। দু’হাতে জড়িয়ে ধরে বুকে আনা যায় গভীর সাগর। প্রাঞ্জল তখন স্পষ্ট শুনতে পায় প্রীতির নূপুরের শব্দ, হাতের চুড়ির ঝনঝনানি। স্বপ্নের ইচ্ছেগুলোর স্বাদ পায় রাতের নির্জন দুপুরে।

ইচ্ছে করেই প্রীতি একগাল হেসে বেনী দুলিয়ে ছুঁয়ে দেয় প্রাঞ্জলকে। বসে পাশ ঘেঁষে। কথা বলে কবিতার ছন্দের মত,
-নির্জনতা বুঝি খুব প্রিয় তোমার?
চমকে ওঠে প্রাঞ্জল। না, ঘুমের ঘোরের কোন স্বপ্ন নয়। প্রীতি, তারই পাশে।
-কি হল, কথা বলছ না যে?
-কি বলব?
-যা জিজ্ঞেস করলাম তোমাকে?
-জানি না।
-এড়িয়ে যাচ্ছ প্রশ্ন আমার।
-তুমি একটু হাসবে?
-কেন বলত?
-তুমি হাসলে ভেঙ্গে যাবে নীরবতা খান খান হয়ে, নিকষ আঁধার গাঢ় রাত ভরে যাবে মায়াবী, মাধবী জ্যোৎস্নার আলোয়। প্লিজ, হাসো না প্রীতি।
মিষ্টি করে হাসে প্রীতি প্রাঞ্জলের দিকে তাকিয়ে। আঁধার কেটে যায়। সত্যি সত্যি মৌনতা ভাঙ্গে কাঁচের টুকরো মত ঝড়ে পড়ে মাটিতে।
বিস্ময়ে অভিভূত প্রাঞ্জল বলে ওঠে,
-চমৎকার।
-কি?
-তোমার হাসি- আর হাসির কৌশল।
-সত্যি?
-সত্যি-সত্যি-সতি-, তিন সত্যি করলাম, বিশ্বাস হলত?
-অবিশ্বাস করেছি কখনও তোমাকে?
-না।
-তাহলে প্রশ্ন কেন আজ?
-তুচ্ছ ব্যাপার নিয়ে ঝগড়া করতে ভাললাগে না মোটেও।
-আমারও।
-তাহলে ভালবাসার কথা বল, ভবিষতের সুখের কথা বল।
-ছোট্ট একটা ঘর, সে ঘরের বাসিন্দা দুইজন। থাকবে আরও.....
স্বপ্ন ভেঙ্গে যায়। প্রাঞ্জলের পাশে দাঁড়ায় কনক। চপলতা স্বভাব তার। অদ্ভুতভাবে বলে,
-মা তোকে ডাকছে
-কেন?
-রাত হয়েছে অনেক। বারান্দায় বসে কি যে ভাবিস এত, কি হয়েছে তোর?
দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে যায় বুকের গভীর থেকে।
-কিছুই নারে বোন।
-মিথ্যে বলিস শুধু। বলতে যদি না চাস, শুনতে চাই না আমি। তবে বুকের ভেতর লুকানো ব্যথা প্রকাশ পেলেই কমে। জীবন্মৃত হয়ে আছে ইদাংনি প্রাঞ্জল। প্রীতি তাকে ছেড়ে গেছে, সে তো অনেক আগেই। তারপরও তার স্মৃতিগুলো গান হয়ে বাজে হৃদয়ের সারিন্দাতে। ভুলতে গিয়েও মনে পড়ে আরও বেশি করে। বিষলক্ষ্যা ছুরির মত বিঁধে আছে বুকে। মৃত্যুতেই বুঝি এ যন্ত্রণার শেষ।
-তোকে নিয়ে মা-বাবা খুব ভাবে।
-জানি
-তাহলে এমন করিস কেন?
-জেনে শুনে বিষ করেছি পান।
স্মৃতির ঝড়ে বিরানভূমি যেন প্রাঞ্জলের বুক। সব সময় জপে প্রীতির নাম। নির্জনতাই ভাললাগে শুধু। কাছে আসে সত্যি হয়ে প্রীতি। ইদানিং এই অসুখটাই সঙ্গী হয়েছে তার। একা একা থাকলেই আসে ও। কথা বলে। শুনতে পায় কাপড়ের খসখসানি, ছুঁলেও সে যায় না চলে দূরে। মিলিয়ে যায় যখনই কেউ আসে।
মানসিক ডাক্তর দেখেছে কয়েকবার। কাজ হয়নি কোন। দিন দিন বেড়েই চলছে অসুখের আধিপত্য। সে বোঝে সবকিছু। তারপরও নীরব থাকতে পারে না প্রীতি যখন ডাকে। উপেক্ষা করতে পারে না প্রীতির ভালবাসা। অথচ, প্রীতিকে কেড়ে নিয়েছে মৃত্যু অনেক আগে। সবই বোঝে সে। তারপরও এলোমেলো হয়ে যায় শিশুদের পড়তে শেখার মত।
হাজার চিন্তায় ক্লান্ত প্রাঞ্জলের বাবা-মা। একমাত্র বংশের বাতি সে। নিভে গেলে পুড়িয়ে ফেলা কাগজের মত ছাই হয়ে যাবে সব। কিন্তু কি-ই-বা উপায় আছে আর?
-খোকা।
মুখ তুলে তাকাল প্রাঞ্জল- মায়ের মুখের দিকে।
-খেয়েনে খোকা।
-খেতে ইচ্ছে করছে না মা।
-না খেলে বাঁচবি কি করে তুই?
-বাঁচতে আর ইচ্ছে করে না আমার।
-মায়ের সামনে ও কথা কি বলে কেউ?
কোন কথা বলল না সে। মাথা নিচু করে মস্ত অপরাধীর মত রইল চুপচাপ বসে।
মায়ের চোখে পানি। পাথর বাবার বসে আছে পাশে।
বাড়ে রাতের গভীরতা। চিঁ..চিঁ.. ঝিঁ..ঝিঁ.. ডাকে। জোনাক পোকা জ্বলে অর নেভে আঁধার রাতের বুকে। শিয়ালের ডাক, কখনও আবার চিৎকার করে কুকুর। কখনও আবার লাশকাটা ঘরের মত নীরব চারপাশ। জেগে থাকা শুধু একা। না, আসবে প্রীতি রাতের কোলাহল যখই দূর হবে। কি বিচ্ছিরি স্বভাব হয়েছে ইদানিং ওর। নির্জনতা ছাড়া তার ভাললাগে না কিছু। অথচ চোখের কাঁটা ছিল তার নির্জন প্রহরগুলো। স্থিরচিত্রের মত পারতো না সে সময়কে পাশ কাটিয়ে যেতে। মুখে যেন খই ফুটতো অবিরাম। ঠিক তার উল্টো এখন সে। কথা বলতে চায় না মোটেও। স্থির আর নির্জনতাই প্রিয় তার এখন। পরিবর্তনের ছোঁয়াতে কি এতটাই ভাঙ্গাচোরা!
সব থাকতেও কোথায় যেন ফাঁকা মরুভূমি। কি যেন তার নেই। বরফ শীতল বাইরে তবু ভেতেরে আগুন জ্বলে। ঢেউয়ে মত আছড়ে পরে বুকের কূলে স্মৃতিগুলো, ভাঙ্গে বুকের কূল, এভাবে কদ্দিন!
হঠাৎ করেই চুপিসারে ছাদে আসে প্রীতি। প্রাঞ্জল ছিল বসে ছাদের অপর পাশে। স্বপ্নের ঘুম ভাঙ্গার মত চমকে তাকায়,
-তুমি!
-ভাল লাগে না তুমি ছাড়া কিছু।
-আমারও, হঠাৎ করে চলে গেলে কেন?
-যেতে চাইনি আমি তোমার ছেড়ে, কিন্তু.......
-কিন্তু আবার কি?
-ওরাইতো জোর করে.......
-থামলে কেন, বল...
-সে রাতেও ছিল এমনি আঁধার কালো। ঘুমিয়ে ছিলাম আমি আমার ঘরে। হঠাৎ করেই জেগে উঠে দেখি, পশুরা সব ঘোরাফেরা করে। চিৎকার করার সময় দেয়নি ওরা। মুখ বেঁধে নিয়ে গেল, জানি না.. কত দূরে...। তারপর হারিকেনের আলো। চারপাশে গল্প শোনা ভূতেদের পায়চারী। শকুনের মত ছুটে আসে তাজা মাংসের লোভে, বাধা দিয়েও পারিনি সেদিন নিজেরকে বাঁচাতে। তারপর য়ন্ত্রণা....... যন্ত্রণা....... শুধুই যন্ত্রণা.......মনে নেই কিছু আর।
-বুঝতে পেরেছি ব্যাপার।
-কিন্তু, ভাঙ্গা চাঁদের মত সমাজও যাচ্ছে ভেঙ্গে।
-ক্ষয় রুখবে তবে কে?
-তুমি।
-আমি!
-হ্যাঁ, দাঁড়াতে হবে তোমার মত হাজার প্রাঞ্জলের।
-একা আমি, সাহস পাইনে যে।
-এক থেকেই যে গোনা শুরু হয়।
-পিছুটানকে পারিনে এড়াতে।
-সামনের দিকে এগোতে হলে পেছন ভুলতে হবে।
-পারিনে যে আমি।
-পারতে হবে।
-শক্তি কোথায় আমার?
-আমি দেব।
-সাহস?
-তাও দেব আমি।
-আসে যদি আঁধার?
-দেব আলো আমি।
-পথ যদি হয় বন্ধুর?
-সঙ্গে থাকব আমি।
-তুমি কে?
-তোমার সব।
আঁধারের ঘুম ভাঙ্গল যেন হঠাৎ আলো দেখে। কোন জাদু বলে মৃত দেহে ফিরে এল প্রাণ। বসা থেকে উঠে দাঁড়াল প্রাঞ্জল। তাকাল চারদিকে। রাতের হয়েছে শেষ। একটু পরেই ফুলের মত ফুটবে সূর্য পূব আকাশের কোলে। আঁধার যাবে কেটে। আসবে আবার আলোয় রাঙা ভোর। কেটে যাবে ক্লান্তিকর বিষাদের মাখা পেছনের দিনগুলো। এখন শুধু সামনে দিকে চলা, মিথ্যে হটিয়ে সত্যকে আজ দিতে হবে পিঁড়ি। জঞ্জাল সাফ করে সমাজটাকে করতে হবে বেহেশতের ফুল বাগান। এটাই চাওয়া তার।