গুপ্তঘাতক

 

মূলঃ লিয়াম ও’ফ্যায়ার্টি            অনুবাদঃ  রাহাদ আবির


[লেখক পরিচিতিঃ
লিয়াম ও'ফ্যায়ার্টি -র জন্ম ১৮৯৭ সালে উত্তর আয়ারল্যান্ডে। ডাবলিন বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াকালীন ১৯১৫ সালে তিনি সামরিক বাহিনীতে যোগ দেন। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময়ে বেলজিয়ামে যুদ্ধ করেছেন। যুদ্ধে গোলার আঘাতে গুরুতর আহত হওয়ায় ১৯১৭ সালে তিনি চাকরি থেকে অব্যাহতি পান। ডাবলিনে ফিরে তিনি গৃহযুদ্ধের সময় রিপাবলিকানদের সঙ্গে যুক্ত হয়ে পড়েন। লেখালেখি শুরু করেন ১৯২১ সালে। প্রথম উপন্যাস দাই নেইবার’স ওয়াইফ (১৯২৩)। তার বেশ ক’টি উপন্যাসের নাট্যরূপও দেয়া হয়েছে। চিরকুমার লিয়াম ও'ফ্যায়ার্টি  ১৯৮৪ সালে মারা যান। ‘গুপ্তঘাতক’ তার দ্য স্নাইপার গল্পের অনুবাদ।

ছবি-স্টিভ মামফোর্ডের আঁকা চিত্র]

 


জুনের দীর্ঘ গোধূলি শেষে রাত্রি শুরু। ডাবলিন শহর অন্ধকারের খামে এলিয়ে পড়ে। কিন্তু চাঁদের অস্পষ্ট আলো পশমি-মেঘ ভেদ করে ভোরের ফ্যাকাসে আলোর মতো ছড়িয়ে পড়ছে রাস্তায় আর অন্ধকার লিফি নদীর জলে। অবরুদ্ধ ফোর-কোর্টসের চারপাশ থেকে কামান গর্জে উঠল। শহরের এখানে-সেখানে মেশিনগান আর রাইফেলের আওয়াজ নির্জন ফার্মে পাহারারত কুকুরের ঘেউ ঘেউ ধ্বনির মতো থেকে থেকে রাতের নিঃশব্দতা ভেঙে দেয়। রিপাবলিকান ও ফ্রি-স্টেটস-পন্থীদের মধ্যে গৃহযুদ্ধ চলছে। ও’কানেল ব্রিজের পাশের একটি বাড়ির ছাদে রিপাবলিকান এক সৈন্য আড়ালে লুকিয়ে পাহারারত। সৈন্যটির একপাশে তার রাইফেল শোয়ানো আর কাঁধে দূরবীন। তার মুখটি পড়ুয়া-ছাত্রের মতো রোগা পাতলা এবং সংসারত্যাগী ভাব। কিন্তু চোখে দৃঢ়তার দ্যুতি। তার চোখের গভীর, চিন্তামগ্ন দৃষ্টি দেখে মনে হবে সে মৃত্যু দেখে অভ্যস্ত।

সে গোগ্রাসে একটি স্যান্ডউইচ খাচ্ছিল। সকাল থেকে পেটে কিছুই পড়েনি। স্যান্ডউইচটি শেষ হলে পকেট থেকে হুইস্কির বোতল বের করে এক ঢোক গিলে আবার পকেটে রাখে। কয়েক মুহূর্ত নিশ্চল থেকে ভাবে, এখন একটি সিগারেট ধরানোর ঝুঁকি নেয়া ঠিক হবে কিনা, যদিও ব্যাপারটা বিপজ্জনক। কারণ সিগারেটের অগ্নিশিখা প্রহরারত শত্রুদের চোখে সহজেই অন্ধকার পড়বে। যা থাকে কপালে! ঠোঁটের ফাঁকে সিগারেট রেখে সে দেশলাই জ্বালায়। তাড়াতাড়ি এক টানে ধোঁয়া ভেতরে নিয়েই আগুনটা নিভিয়ে ফেলে। প্রায় সাথে সাথে একটি গুলি ছাদের পাঁচিল ঘেঁষে চলে যায়। গুপ্তঘাতক সিগারেটটি আরেকটি টান দিয়ে নিভিয়ে ফেলে। তারপর বিড়বিড়িয়ে ঈশ্বরের নাম নিয়ে হামাগুড়ি দিয়ে বাঁ দিকে সরে যায়। সতর্কতার সঙ্গে মাথা একটু উঁচিয়ে পাঁচিল থেকে উঁকি মারে। একটু স্ফুলিঙ্গ। পরক্ষণেই একটা গুলি সাঁ করে তার মাথার ওপর দিয়ে ছুটে যায়। সে তৎক্ষণাৎ মাথা নামিয়ে ফেলে। স্ফুলিঙ্গটা সে দেখেছে, গুলিটা রাস্তার অপর প্রান্ত থেকে ছোড়া হয়েছে। গুপ্তঘাতক ছাদ গড়িয়ে চিমনির পেছনে খড়ের গাদার কাছে যায় এবং ধীরে ধীরে গাদার ওপর উঠতে থাকে যতক্ষণ পর্যন্ত না তার চোখ পাঁচিলের দেয়ালের সমান্তরালে আসে। কিছুই দেখা যায় না। শুধু নীল আকাশের নিচে বিপরীত দিকের বাড়ির চূড়ায় একটি অস্পষ্ট আলোর বৃত্ত। শত্রুটি হয়তো কোনো কিছুর ভেতর লুকিয়ে পড়েছে।
ঠিক তখনই একটি সাঁজোয়া গাড়ি ব্রিজ পার হয়ে রাস্তায় নামে। পঞ্চাশ গজ দূরে রাস্তার বিপরীত দিকে থামে। গুপ্তঘাতক গাড়িটির বিশ্রী হাঁপানির শব্দ শুনতে পাচ্ছিল। তার হার্টবিট বেড়ে যায়। ওটা শত্রু-গাড়ি। তার ইচ্ছা হচ্ছিল গুলি চালায় কিন্তু জানে তা বৃথা। কারণ তার বুলেটগুলো কখনই ধূসর-দৈত্য আবৃত ঐ ইস্পাতকে ছিদ্র করতে পারবে না। সেই মুহূর্তে রাস্তার পাশের কোণ ধরে এক বৃদ্ধ মহিলা এল। তার মাথা জীর্ণ শালে ঢাকা। মহিলাটি গাড়িতে কামানের দায়িত্বে থাকা লোকটির সাথে কথা বলে ছাদের দিকে অঙ্গুলি নির্দেশ করে যেখানে গুপ্তঘাতক শুয়ে আছে। আসলে মহিলাটি একজন চর। গাড়ির কামানের ঢাকনা খুলে যায়। একজন সৈন্যের মাথা ও কাঁধ উঠে আসে গুপ্তঘাতককে খুঁজছে। গুপ্তঘাতক দেরি না করে রাইফেল তাক করে গুলি করে। মাথাটি দিড়িম করে ঢাকনার ওপর পড়ে। মহিলাটি তীরবেগে রাস্তার দিকে ছোটে। গুপ্তঘাতক ফের গুলি করে। মহিলাটি পাক খেয়ে চিৎকার করে নর্দমায় পড়ে যায়।
হঠাৎ বিপরীত দিকের ছাদ হতে গুলির আওয়াজ। গুপ্তঘাতক খিস্তি করে রাইফেলটি ফেলে দেয়। রাইফেলটি ছাদে ঝনঝন শব্দ তোলে। গুপ্তঘাতকের মনে হলো এই শব্দ বোধ হয় মৃতকেও জাগিয়ে দেবে। রাইফেলটি তুলতে চেষ্টা করে দেখে তুলতে পারছে না। তার হাত অসাড়। সে বিড়বিড় করে, হায় ঈশ্বর আমি আহত হয়েছি। সোজাভাবে নিচে পড়ে সে হামাগুড়ি দিয়ে ছাদের কিনারের দিকে এগিয়ে যায়। বাঁ হাত দিয়ে তার ডান হাতের ক্ষত পরখ করে। রক্ত জামার হাতা দিয়ে ফোঁটায় ফোঁটায় গড়িয়ে পড়ছে। ব্যথা নাই কেবল একটা অসাড় অনুভূতি যেন হাতটা কেটে ফেলা হয়েছে।
দ্রুত সে পকেট থেকে ছুরি বের করে। বুক-সমান প্রাচীরের কাছে ছুরি দিয়ে তার জামার হাতা চিরে ফেলে। গুলি ঢোকার জায়গাটায় ছোট্ট গর্ত হয়ে গেছে। উল্টো পাশে কোনো গর্ত হয়নি, তার মানে গুলিটা হাড়ে বিঁধেছে। নিশচয়ই হাড় ভেঙেছে। সে ক্ষতের নিচে হাতটা বাঁকায়। ব্যথায় তার দাঁত মাটিতে ঠেকে যায়।
তারপর ব্যান্ডেজ বের করে ছুরি দিয়ে প্যাকেটটা চিরে আয়োডিন বোতলের মুখ ভেঙে তরল ক্ষতস্থানে ঢালে। একটা ভয়ঙ্কর তীব্র ব্যথা সারা দেহে ছড়িয়ে পড়ে। ক্ষতস্থানে এক দলা তুলা রেখে সে ব্যান্ডেজ বাঁধে। দাঁতের সাহায্যে বাঁধনটা শক্ত করে। এরপর প্রাচীরের গায়ে হেলান দিয়ে শুয়ে চোখ বন্ধ করে ব্যথা সহ্য করতে চেষ্টা করল।
নিচের রাস্তা একেবারে নির্জন। ব্রিজের ওপর সাঁজোয়া-গাড়িটি ছাদে মৃত বন্দুকধারীর ঝুলন্ত-মাথা নিয়ে পুরোদমে বিশ্রাম নিচ্ছে। মহিলার মৃতদেহটি এখনও নর্দমায় পড়ে আছে।
গুপ্তঘাতক দীর্ঘ সময় শুয়ে থেকে হাতের শুশ্রূষা করল আর পালানোর পরিকল্পনা আঁটল। এ জখম নিয়ে সকাল পর্যন্ত তার ছাদে থাকা সম্ভব নয়। বিপরীত ছাদের শত্রুটি তার পালানোর পথ আটকে আছে। ব্যাটাকে যেভাবেই হোক অবশ্যই শেষ করতে হবে এবং সেটা বন্দুক ব্যবহার না করেই। এই কাজে তার কেবল একটা পিস্তল আছে। সে একটা ফন্দি আঁটে।
তার টুপি খুলে তার বন্দুকের মুখে রাখল। তারপর বন্দুকটি আস্তে আস্তে উঁচু করে যতক্ষণ পর্যন্ত না তা রাস্তার অপর দিক থেকে দেখা যায়। প্রায় সাথে সাথেই উত্তর আসে একটা গুলি টুপির মাঝখান ভেদ করে দেয়। গুপ্তঘাতক বন্দুকটি গড়িয়ে সামনের দিকে নিয়ে যায়। টুপিটি পিছলে রাস্তায় পড়ে। বন্দুকটির মাঝখানে ধরে সে তার বাম হাতটি মৃতপ্রায়ভাবে ছাদের গায়ে ঝুলিয়ে দেয়। কয়েক মুহূর্ত পর সে বন্দুকটা রাস্তায় পড়ে যেতে দিল। তারপর টেনে নিয়ে ছাদে তলিয়ে গেল। বামদিকে হামাগুড়ি দিয়ে ছাদের কোণে উঁকি দিল, তার কৌশল কাজে লেগেছে। অপর গুপ্তঘাতক তার বন্দুক ও টুপি পড়ে যেতে দেখে ভেবেছে সে মারা গেছে। এখন সেই আহাম্মক চিমনি সারির বগলে দাঁড়িয়ে সামনের দিকে দেখছে, পশ্চিমাকাশে ওর মাথার ছায়া সুস্পষ্ট। রিপাবলিকান গুপ্তঘাতক হেসে প্রাচীর প্রান্ত থেকে তার পিস্তল ওঠায়। দূরত্বটা পঞ্চাশ গজের মতো। তার ডান হাতে প্রচন্ড ব্যথা যেন হাজার পিশাচ ওতে ভর করেছে। সে লক্ষ্য স্থির করে। উত্তেজনায় তার হাত কাঁপছে। ঠোঁটে ঠোঁট চেপে সে বড় একটা নিঃশ্বাস নেয় এবং গুলি করে। তার হাত ঝাঁকি খায় এবং কয়েক সেকেন্ড প্রায় বধির হয়ে যায়। তারপর ধোঁয়া পরিষ্কার হলে উঁকি দিয়ে সে উল্লসিত হয়। তার শত্রু মৃত্যু যন্ত্রণায় প্রাচীরের ওপর টলমল করছে, দাঁড়ানোর প্রাণান্ত চেষ্টা করছে কিন্তু ধীরে ধীরে পড়ে যাচ্ছে যেন স্বপ্নঘোরে আছে। বন্দুকটি ওর মুঠি থেকে পড়ে যায় প্রাচীরে আঘাত করে এবং নিচে নাপিতের দোকানের খুঁটিতে বাড়ি খেয়ে রাস্তায় ঝনঝন শব্দ তোলে।
ছাদের ওপর মৃত্যুপথযাত্রী ব্যক্তিটি ভাঁজ হয়ে সামনের দিকে পড়ে। শরীরটা শূন্যে কয়েকবার পাক খেয়ে মাটিতে ধপ করে পড়ে যায়। আর তারপর চিরজনমের মতো শান্ত হয়ে পড়ে থাকে।
গুপ্তঘাতক তার শত্রুকে পড়ে যেতে দেখে শিউরে ওঠে। তার যুদ্ধের ইচ্ছা মরে যায়। ভেতরে ভেতরে অনুতাপ জাগে, কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম জমে ওঠে।
হাতের ক্ষতটা তাকে দুর্বল করে দিয়েছে। তাছাড়া গ্রীষ্মের লম্বা দিনে ক্ষুধার্ত অবস্থায় ছাদে পাহারা দিয়েছে। সব মিলিয়ে মানসিকভাবেও সে প্রচ- দুর্বল। তাই শত্রুসেনার ক্ষত-বিক্ষত মৃত শরীরটা দেখে সে ভয় পেয়ে যায়। ভয়ে তার দাঁতে ঠকঠক শব্দ হয়, সে আবোল-তাবোল বকতে শুরু করে যুদ্ধকে, নিজেকে এবং পৃথিবীকে অভিশাপ দিতে থাকে। ছাদের ওপর ধোঁয়া ওঠা পিস্তলটার দিকে তাকিয়ে ঘৃণার সঙ্গে সেটা পায়ের কাছে ফেলে দেয়। পিস্তলটি সশব্দে ছিটকে পড়ে এবং একটা গুলি তার মাথার কাছ দিয়ে সাঁ করে ছুটে যায়। এ আকস্মিকতায় তার চেতনা ফিরে আসে, স্নায়ুগুলো স্থির হয়। ভয়ের মেঘ মন থেকে সরে যায়। গুপ্তঘাতক হেসে ওঠে।
পকেট থেকে হুইস্কির বোতল বের করে এক ঢোকে তা শেষ করে। নতুন জীবনীশক্তিতে এখন সে বেপরোয়া। ছাদ ত্যাগের সিদ্ধান্ত নেয়। তার কমান্ডারকেও খুঁজে বের করতে হবে রিপোর্ট দেয়ার জন্য। চারপাশ একদম নীরব। রাস্তায় হাঁটাচলায় এখন আর তেমন বিপদ নেই। পিস্তলটা তুলে সে পকেটে রাখে। তারপর ছাদের জানালার ফাঁকে হামাগুড়ি দিয়ে নিচের বাড়িতে নামে।
গুপ্তঘাতক যখন গলিপথ ধরে রাস্তার কাছে আসে, হঠাৎ তার মধ্যে কৌতূহল জাগে মৃত শত্রুর পরিচয় জানার। শত্রুটি যে ভালো নিশানাকারী, এটা তাকে মানতেই হবে। হতেও তো পারে তার পরিচিত। হয়তো সামরিক বাহিনী ভাগের আগে তারা একই সেনাদলে ছিল। ঝুঁকি নিয়ে শত্রুটিকে এক নজর দেখার সিদ্ধান্ত নিল সে। ও'কানেল রাস্তার কোণে উঁকি মারল। রাস্তার বাইরের অংশে তখনও প্রচন্ড গোলাগুলি চলছে কিন্তু এ-দিকটা শান্ত।
গুপ্তঘাতক রাস্তা ধরে ছুট দেয়। একটি মেশিনগান থেকে এক ঝাঁক গুলি তাকে লক্ষ করে বর্ষিত হলো। কিন্তু সে বিপদ এড়াতে সক্ষম হয়। সে একটি মৃতদেহের ওপর উপুড় হয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ে। মেশিনগান থেমে যায়।
গুপ্তঘাতক ঘুরে মৃতদেহের মুখের দিকে তাকাতেই দেখে সেটা তার ভাইয়ের মুখ।