সে আসে ধীরে

রবিউল করিম


সে আসে ধীরে, নক্ষত্রলোকের পুঞ্জীভূত যেসব ধোঁয়াশা শিশির বিন্দুসম ঝুলে থাকে ললাটে তারই অংশভাগ কোন্ এক কুহকের ঘোর মাতমে লীন হয়ে গেলে পর টুপ করে ঝরে পড়ে; শুধু কি ঝরে পড়ে নাকি, বিশাল নীল, অনাবিল প্রশস্ত কোন্ ঘূর্ণিপাকের আবর্তে লীন হয়ে ঘুরতে ঘুরতে সে হয়ে ওঠে অন্যকিছু - খড়কুটো, মৃত বোয়ালের চোখ, নীলাভ শিশুর মাড়িতে লেগে থাকা স্তনের বোটাকৃতি শামুকের পশ্চাৎভাগ, একটি বুলেটের খোসা, ধার অমলিন সাড়ে চার ইঞ্চি স্টেইনলেস স্টিলের চাকু, লাল-বেগুনি বুদবুদ নিয়ে স্থিরবন্দি মার্বেল - কেউ জানে না; কেননা এত বহুরূপী ছদ্মাবরণের ভেতরে ঢাকা তার সমগ্র অস্তিত্ব - এত ভূজ, উপত্যকা, ছায়া ঘেরা; মুহূর্তেই হয়ে ওঠে হন্তারক, সূতাসাপ, রক্ত চোষা রাক্ষুসী, বরফজাদী, এক চোখা দৈত্য, তারচেয়েও বড় সত্য সে আসে ধীরে, এত ধীরে যে একটা বেড়াল যেরকম পায়ে পায়ে এগিয়ে যায় শিকারের দিকে কিংবা একটা শামুক যে একাগ্রতায় সময়কে পলে পলে বিভক্ত করে নিজেকে টেনে নিয়ে যায় গন্তব্যে - ঠিক সেরকম ধীরে, নৈশব্দের সমস্ত সতর্কতার গায়ে লেপ মুড়িয়ে, কেননা মুহূর্তের সতর্কতা কিংবা বিচ্ছিন্নতায় সে চতুর এমনভাবে হাওয়ায় মিলিয়ে যেতে পারে যে, একটা খরগোশ এইমাত্র তার শাদা পায়ের দ্যুতি ছড়িয়ে সবুজ ঘাসের শরীরে হাওয়া অথবা একটা বিদ্যুত ঝলক মুহূর্তেই সারা মর্ত্যকে আলোকিত করে গভীর তন্দ্রায় নিমজ্জিত - অথচ এতসব সতর্কতা এতসব আয়োজন সবকিছুই অপরিকল্পিত, চেতনার কোনো কৌণিক বিন্দুতেও তার সূক্ষতম উপস্থিতি বর্তমান থাকে না, অথচ সে সবই জানে - বুকের কোন লোমশ অংশে পূর্ণিমার মায়াবী আলোয় একদা এক রমণী সঁপে দিয়েছিল নিজেকে, ওষ্ঠের কোন্ প্রান্ত এখনো তৃষ্ণার্ত গোলমরিচের মতো স্তনের স্বাদ পেতে, কবে কোথায় সন্ধ্যার ম্লান আলোয় কেঁদেছিল নৌকার গলুই ধরে এক পতিতার হাতে কৌমার্য হারিয়ে, কবে মায়ের চুরি করা সোনার নোলক বিক্রি করে আকণ্ঠ ডুবেছিল মদে, দিঘলীর বিলে কেন প্রাণকে তুচ্ছ করে দেখেছিল দুই কালকেউটের সম্ভোগ কিংবা কেন হঠাৎ করেই আত্মহত্যার বাসনা মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে চায়;... এতসব জানার পরও সে ঝিম মেরে মুখ লুকিয়ে রাখে অলীক কাছিমের পিঠের শক্ত খোলশের ভেতর কিংবা পড়ে থাকে একটা মথের মতো শরীরের ভেতরে এইসব সূতো গুটিয়ে গুটিয়ে তারপর সহসা কোন্ ইশারায় সবকিছু নিয়ে সেই নক্ষত্রলোক থেকে ঝুলে পড়ে বুকের গহীনে আর তখন রাত কিংবা দিন কোনো সময়ের তোয়াক্কা না করে কাঁপিয়ে, ঝাঁপিয়ে, হাসিয়ে, ঝুলিয়ে সে মেতে ওঠে শিবতাণ্ডবে - চরাচরের সমস্ত কিছু তখন এত তুচ্ছ, এত হীন, এত লঘু যে, সে ছাড়া সমস্ত কিছু মিথ্যে, মায়া অথচ সে নিজেই এত পলকা, এত ভঙ্গুর যে, কী করে এত এতসব জীবন জঞ্জালের সুতো দিয়ে বানিয়ে চলে এমনসব ভারবাহী কৃত্রিম বিশালজগৎ তা আজ ও আগামীকালের বিস্ময়; আর সে চতুর, তূরীয় জগতের তূণ হলো - স্বপ্ন, যাকে ছাড়া আমাদের এই জগৎ অর্থহীন প্রপঞ্চে বন্দি।