হ্রদ, ঝরনা ও পাহাড়ের দেশে


পার্থ প্রতিম চৌধুরী
(ppchyum@gmail.com)



ডিসেম্বরের এক হাড়কাঁপানো শীতল ভোরে আমরা যখন বান্দরবনে পৌছালাম তখন সবে মাত্র কুয়াশার চাদর সরিয়ে সারি সারি পাহাড়গুলো জেগে উঠছে। পাহাড়ঘেরা উপত্যাকার পাশে সাঙ্গু নদী নিয়ে বান্দরবনের ছোট ছোট বিল্ডিংয়ের সারিগুলো তখনো কুয়াশায় ঘেরা।ঢাকা থেকে বান্দরবন আসার উদ্দেশ্য বাংলাদেশের সর্ববৃহৎ প্রাকৃতিক হ্রদ 'রাইখিয়াং'  এবং তার পাশ্ববর্তী খরস্রোতা 'রাইখিয়াং ঝিরি' দেখা। এই লেকটি রাঙামাটিতে অবস্থিত হলেও পাহাড়ী দুর্গমতার কারনে যেতে হয় বান্দরবনের রুমা থানা হয়ে। পথে আমার সঙ্গী তারেক, ইমন, সমীর, সোহেল, জনি, তপন, শোভন।

 

বান্দরবন থেকে 'চাঁদের গাড়ি' নামে খ্যাত লক্করঝক্করমার্কা জীপ ভাড়া করে আমরা রওনা দিলাম বায়ান্ন কিলোমিটার দূরের রুমা বাজারের উদ্দেশ্যে। রুমা যাওয়ার এই পাহাড়ী সংকীর্ণ ও সর্পিল রাস্তাটির দুই পাশের দৃশ্য সত্যি মনোমুগ্ধকর। রুমা বাজার থেকে সাঙ্গু নদী দিয়ে দুই ঘন্টার নৌকা ভ্রম শেষে রুমা গ্যারিসনের ঘাটে যখন পৌছালাম সূর্য তখন দিনের কাজ শেষে আঁধার ডেকে আনার প্রস্তুতি নিচ্ছে। হোটেলে ব্যাগ রেখে গাইড ঠিক করতে গিয়ে বোধোদয় হলো পরদিন ক্রিসমাস। আর গাইডদের মাঝে সিংহভাগই বম উপজাতি যারা ক্রিশ্চান ধর্মের অনুসারী। ক্রিসমাস উদযাপন ফেলে এদের কেউই গাইড হতে রাজী হলো না।চিন্তায় আমাদের কপালের ভাঁজ যখন চওড়া হচ্ছে হঠাৎ দেখা হয়ে গেল আমাদের বহু পুরনো গাইড জিংরাম বম-এর সাথে আমাদের কপালের ভাঁজ মেলানোর সাথে সাথে মুখের হাসিও চওড়া হতে লাগলো। জিংরাম বম গাইড হিসাবে আমাদের সাথে যেতে রাজী হলো। রাতের খাওয়া সেরে সবাই ঘাটে গিয়ে বসলাম। সামনে কুয়াশায় মোড়ানো নদীর বুকে হালকা জোছনা, নদীর ওপারে কালচে পাহাড়ের সারি, তার ওপাশে কুয়াশায় মৃদু চাঁদ। সবকিছু কেমন জানি রহস্যমাখা মায়ায় ঘেরা।

নদীর স্রোতের শব্দ কি যেন এক প্রাচীন অর্কেস্ট্রার মতো শোনায়। আমরা অপলক দৃষ্টি নিয়ে তাকিয়ে রইলাম। পরদিন সূর্য ওঠার আগেই আমরা তৈরী হয়ে বের হলাম। শুরু হলো দীর্ঘ হাঁটা পথ। সূর্য তখন সবে মাত্র পাহাড়ের ওপারে মৃদু আলো ছড়িয়েছে।কুয়াশায় সবকিছু ঢাকা পড়ে আছে। তীব্র ঠান্ডা বাতাস রুমা গ্যারিসনের পাহাড় টপকে নীচে নামতেই ঝরনার শীতল পানিতে আমাদের পা ভেজাতে হলো। এই ঝিরির পাড়ে পাড়ে হাঁটা পথ। ঝরনার দুই পাশে উঁচু উঁচু পাহাড়। মারমাদের গ্রাম 'বগামুখ' - এ বারোটা নাগাদ পৌছানো গেল। এখানে মারমাদের দোকানে চা আর সঙ্গে আনা বিস্কিট খেতে খেতে আমরা বিশ্রাম নেয়ার সাথে সাথে মানসিক শক্তিও সঞ্চয় করতে লাগলাম। কারণ এরপরই শুরু হবে আকাশছোঁয়া চড়াই পথ। সমুদ্র সমতল থেকে আমাদের উঠতে হবে প্রায়ই তিন হাজার দুইশ ফুট উপরে।
 

শুরু হলো আমাদের কষ্টকর চড়াইয়ে উঠা। মাথার উপরে সূর্য তার আগুন ঢাললেও পাহাড়ী বাতাস আর নীলচে সবুজ সৌন্দর্য কষ্টগুলো মুছে নিয়ে যাচ্ছিল। যত উপরে উঠছি ততই দুর পর্যন্ত দেখা যাচ্ছে সবুজ পাহাড়ের সারিগুলো। সে এক অসাধারন দৃশ্য। মাঝে মাঝে পাহাড়ীদের বাশের তৈরি জুমের মাচা। সেখানে শুয়ে শুয়ে বিশ্রাম নেয়। চোখের সামনে পাহাড়ের ল্যান্ডস্কেপ আর হু হু বাতাস। পাঁচটায় আমাদের পাহাড়ের চূড়ায় ওঠা শেষ হলো। একটু নিচে নামতেই ঝিরি পাওয়া গেল। সেখানে হাতমুখ ধুয়ে শীতের জামা-কাপড় পড়ে নিলাম। কারন পাহাড়ে রাত নামে একেবারে হঠাৎ করে। আর রাত নামতেই প্রচন্ড ঠান্ডা পড়ে।

 

সেই ঝিরি পার হয়ে কিছুদুর যেতেই ত্রিপুরাদের গ্রাম 'আনন্দপাড়া'। সেখানে কারবারীর ঘরে আমাদের রাতের আশ্রয় হলো। এরা ত্রিপুরা উপজাতি হলেও ক্রিশ্চান। তাই ক্রিসমাস উদাযাপনের আনন্দে সবাই উৎসবমুখর। আমরা সারাদিনের ক্লান্তি ভুলে তাদের উৎসবে যোগ দিলাম। ত্রিপুরা ভাষায় গান ও পাহাড়ী ঢোলের তালে তালে ত্রিপুরা তরু-তরুণীদের নৃত্য। সে এক ভিন্ন স্বাদের সংস্কৃতির ছোঁয়া। ত্রিপুরারা আমাদের বাঁশের ভিতর তৈরি করা মিষ্টি ভাতের পিঠা উপহার দিলো। সেই পিঠা খেয়ে পেট একটু ঠান্ডা করেই রাতের খাবার তৈরি করার প্রস্তুতি নিলাম। মেনু হলো পাহাড়ী মুরগীর ঝোল আর পাহাড়ীর লাল চালের ভাত।


পরদিন ভোরে আবার পথচলা। এবার প্রথমে উৎরাই। দুটো পাহাড় আমাদের নামতে হলো। এই পথজুড়ে সাধারনত দেখা যায় বাঁশ। সব পাহাড়ে সাধারণত বাঁশের আধিক্য দেখা যাবার কথা। কিন্তু দেখা গেলো কোন বাঁশ নেই। অন্যান্য পাহাড়ী আগাছা আর গাছ এর জায়গা দখল করে নিয়েছে। গাইডকে জিজ্ঞাসা করতেই জানা গেল বাঁশের ফুল ফুটেছিল গেল বছর। আর বাঁশের ফুল ফুটলে সব বাঁশ একসাথে মরে যায়। পরবর্তীতে ধীরে ধীরে আবার জন্ম নেয়। তবে এতে বেশ কিছু বছর সময় নেয়। নামা শেষ হলে পড়লো খুব সুন্দর একটা ঝরনা। ছায়ায় ঘেরা পাড়ে আমরা আগুন জ্বেলে সঙ্গে আনা পাতিলে চা বানিয়ে খেলাম। কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিয়ে আবার শুরু হলো পাহাড়ে ওঠা। ক্লান্তির শেষ সীমানায় পৌছে বিকেল নাগাদ আমাদের দুটো পাহাড় পেরিয়ে তৃতীয় পাহাড়ের চূড়ায় ওঠা শেষ হলো। চূড়ায় উঠতেই নিচের উপত্যকার ফুটে থাকা নীল পদ্মের মতো 'রাই খিয়াং' লেকের দৃশ্য মনের সব ক্লান্তি দুর করে দিল। চূড়া থেকে নিচে নেমে লেকের পাড়ের 'পুকুরপাড়া'-য় পৌঁছতে না পৌঁছতেই সন্ধ্যা নেমে এল। এটাও ত্রিপুরাদের গ্রাম।

নিরুয়ান ত্রিপুরার বাসায় আমরা আশ্রয় নিলাম। নিরুয়ান ত্রিপুরা খুব হাসি-খুশি ভালো মানুষ। পুকুরপাড়ায় বলতে গেলে সেই একমাত্র পাহাড়ী যে বাংলা ভাষায় কথা বলতে পারে। নিরুয়ানদার আতিথ্যে রাতের খাওয়া সেরে বারান্দায় এসে আমরা যখন বসলাম রাতের নিস্তব্ধতার সাথে যোগ দিয়েছে পাহাড়ী নৈব্দ্য আর জোছনার মায়াবী আলো। হু হু করে বয়ে যাওয়া শীতল বাতাস উপেক্ষা করে আমরা নির্জন গহীন পাহাড়ের রাত উপভোগ করলাম।


পরদিন ভোরে হ্রদ দেখার পালা। ছোট টিলা পার হতেই বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় প্রাকৃতিক লেক। তার নীল জলরাশি নিয়ে যেন আমাদের জন্যেই অপেক্ষায় ছিল। লেকের পাড় ঘেঁষে উঠে গেছে ঢালু পাহাড়। এক পাড়ে বিডিআর ক্যাম্প ও পুকুরপাড়া, আর অন্য পাড়ে ত্রিপাঞ্চি পাড়া। লেকের পানি ছুঁয়ে আমরা অন্য পাড় দিয়ে উঠে যেতে শুরু করলাম। দুই ঘন্টা চড়াই শেষে পাহাড়ের উপর থেকে নীচে দেখা যেতে লাগল রাইখিয়াং ঝরনা। পাথুরে গিরিখাত বেয়ে প্রচন্ড গর্জন করে ছুটে যাচ্ছে নিচের দিকে ফেনা তোলা স্বচ্ছ শীতল জল নিয়ে। আমরা খুব সাবধানে তার পাড় দিয়ে হেঁটে যেতে লাগলাম। পায়ের নিচে শ্যাওলায় পিছল ভেজা পাথুরে চাতাল। একটু অসাবধান হলে পিছলে একেবাড়ে খাতের নিচে পড়ে যেতে হবে। কিছু দুর যাওয়ার পর দেখা গেল ঝরনার পানি একটা সমতল জায়গায় জমে পুকুরের মতো আকার ধারন করেছে। যার অন্য পাড় থেকে আবার শুরু হয়েছে নিচের দিকে ছুটে চলা।


 

হ্রদ আর ঝিরি দর্শন শেষে পরদিন আমাদের যাত্রা শুরু। গন্তব্য বাংলাদেশের সর্বোচ্চ জনবসতি সাইকতপাড়া ও তার পর সবচেয়ে উঁচুতে অবস্থিত প্রাকৃতিক লেক বগালেক।

আমরা ফেরার পথ ধরি। পিছনে পরে থাকে হ্রদ, ঝরনা, পাহাড়ি ভালোমানুষেরা আর পাহাড়ের নিসর্গ । আর মনের মাঝে থাকে সতেজ অনুভূতি আর আবার ফিরে আসার প্রতিশ্রুতি।