তাহার সঙ্গে কথা
বিশ্বদেব চট্টোপাধ্যায়

দৃশ্য একঃ


বিছানায় শয্যাগত মানুষটার চোখে যাতে আলো না লাগে এমনভাবেই টেবিলল্যাম্পটা কাগজের ওপর ফোকাস করে একটা কাব্য নাটকের শেষাংশ লিখে চলেছে মল্লিকা। মানুষটা অর্থাৎ মল্লিকার স্বামী বিজনের কিন্তু তাতেও যথেষ্ট অসুবিধে হচ্ছে। সাদা কাগজে টেবিলল্যাম্পের আলো প্রতিফলিত হয়ে দেওয়ালে ছড়িয়ে পড়ছে। তীব্র নয়, ছায়া ছায়া আলোর আভা দেওয়াল থেকে প্রতিফলিত হয়ে বিজনের চোখে এসে লাগছে। লাগাটা সামান্য হলেও বিজনের চেতনায় সেটা অসামান্য বিরক্তিকর হয়ে ওঠায় সে রীতিমতো উশখুশ করছে। ইতিমধ্যে বার কয়েক বিরক্তিসূচক শব্দও গলা দিয়ে বের করেছে এবং গোটা কয়েক সিগারেট ধরিয়ে কয়েকবার টেনে অ্যাশট্রেতে গুঁজে দিয়েছে। তবুও মল্লিকার মনযোগ বিন্দুমাত্র ক্ষুণ্ণ হয়নি। মল্লিকার এই অখন্ড মনযোগ বিজনকে ক্রমশই উত্তেজিত করে তুলছিল। তার এই মনযোগ ছিঁড়ে খুঁড়ে তছনছ করার জন্যে আজো বিজন নীলছবি চালিয়েছিল এবং প্রায় ঘন্টাখানেক ছবি চলতে থাকলেও মল্লিকার মনঃসংযোগে চিড় ধরাতে পারেনি সে। আসলে প্রায় নিত্যদিন মল্লিকার শরীর নিয়ে ছিনিমিনি খেলার আগে (অবশ্যই নীলছবির স্টাইলে) বিজনের ঐ ছবি দেখার ব্যাপারটা আর মল্লিকাকে বিচলিত করে না। বিশাল ঘৃণার মেঘ ঢেকে ফেলেছে বিজনকে এবং তার এইসব গা ঘিন-ঘিন করা কান্ডকারখানাগুলোকেও। মল্লিকা তাই বিজনের যাবতীয় প্ররোচনাকে তুচ্ছ করেই একমনে নিজের লেখালেখির কাজ করে যেতে থাকে।

সাদা কাগজ থেকে প্রতিফলিত উজ্জ্বল আলোর আভায় মল্লিকার প্রোফাইল অসাধারণ সৌন্দর্যে এতটাই ঝলমল করছে যে দেখবো না দেখবো না করেও বার বার বিজনকে তাকাতেই হচ্ছে। শরীরের উত্তাপ ক্রমশ মাথার ভেতরে জমা হচ্ছে। ঘড়ির কাঁটা বারোটার ঘরে পৌঁছতে দশ মিনিট সময় নেবে। বিজন বিছানার ওপর পা ছড়িয়ে উঠে বসলো-
-রাত বারোটা বাজে। আমার কিন্তু ভয়ানক ঘুম পাচ্ছে-
-আজ তোমার মোটেও ঘুম পাচ্ছে না। তুমি আমার জন্যে ওয়েট করছো। আরো একটু সময় লাগবে আমার।
মল্লিকা বিজনের দিকে তাকালো না। লিখতে লিখতেই বিজনের চতুরালি লুফে নিয়ে ছুঁড়ে দিল ওর দিকেই। ধরা পড়ে গিয়ে বিজনের মাথার পুঞ্জীভূত উত্তাপ সশব্দে ফেটে পড়তে চাইলো। অনেক কষ্টে নিজেকে সামলে নিয়ে বেশ শব্দ করেই দেওয়ালের দিকে ফিরে শুয়ে পড়লো।

এতক্ষণে লেখাটা একটু থামিয়ে ছায়া ছায়া বিছানার দিকে তাকালো মল্লিকা। বিজনের শরীরে জঙ্গলীছাপ একটা বিদঘুটে বেঢপ বারমুডা ছাড়া অন্য কিছু না থাকায় ওর রোমশ শরীরটা হঠাৎই হাফপ্যান্ট পরা একটা ভালুকের মতো মনে হলো মল্লিকার। ওর মনে হলো বিজনের শরীরে কিছুই না থাকলে হয়তো এতটা অশ্লীল লাগতো না তার। মাথাটা ঝাঁকিয়ে ফিরে এলো লেখায়। কালকেই লেখাটা পত্রিকায় পাঠাতে হবে। দু-এক মাসের মধ্যে মন ভালো হয়ে যাবার মতো এত ভালো লেখা ওর কলম জুড়ে নামেনি। ফলে ভেতরটা অনেকটাই সাদা হয়ে ছিল।
লেখা শেষ হতে হতে সাড়ে বারোটা বেজে গেল। পৃষ্ঠাগুলো পর পর সাজিয়ে ঝর্ণার আঘাতে আঘাতে প্রায় নিটোল গোল হয়ে যাওয়া কালচে হলুদ পাথরটা চাপা দিয়ে রাখলো। টেবিলল্যাম্পের স্যুইচ অফ করে চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়ে অন্ধকার বিছানার দিকে তাকালো। নাইটল্যাম্প জ্বলছে, কিন্তু চোখদুটো ধাতস্থ না হলে কিছুই দেখা যাবে না। কি ভেবে মল্লিকা কাব্যনাটেকের পান্ডুলিপির শেষের কয়েকটা পাতা তুলে নিয়ে বিছানায় উঠে এল। বেড স্যুইচ অন করতেই সাদা আলোয় ঘর ভরে গেল। বাঁ হাত দিয়ে বিজনকে একটু ঠেলা দিল মল্লিকা,
-এই, শেষটা একটু শুনবে? এটা তোমার নিশ্চয়ই ভালো লাগবে।
শরীরটা বিজনের শক্ত হয়ে উঠতেই মল্লিকা মনে মনে হাসলো। জেগে আছে বিজন। আর একটু জোরে ঠেলা দিল মল্লিকা-
-শোন না একটু? এই-
-রাত দুপুরে নষ্ট মেয়ের নষ্ট কবিতা শুনতে হবে? কি ভেবেছো তুমি? এইসব জঞ্জাল আঁস্তাকুড়ে ফেলে দিয়ে আমার সঙ্গে কথা বলবে-
ঝট্ করে বিছানায় বিজনকে উঠে বসতে দেখে মল্লিকা চমকে উঠেছিল। তারপর বিজনের বসার ভঙ্গি, দাঁত মুখের চেহারা দেখে আঁতকে উঠলো একপ্রস্থ। বিজন মল্লিকার প্রায় অবশ হাত থেকে সদ্য লেখা কাগজগুলো ফস্ করে কেড়ে নিয়ে ছুঁড়ে দিল ঘরের মেঝেয়। । পৃষ্ঠাগুলো ঘরের বাতাস কাটতে কাটতে ভাসতে ভাসতে ছড়িয়ে পড়লো ইতস্ততঃ। মল্লিকা বাধা দেবার কোনো অবকাশই পেলো না। পাথর হয়ে গেল মল্লিকা বেশ কিছুক্ষণের জন্যে। বিজন যদি ওর গলাটা টিপে ধরতো তবুও মল্লিকা নড়তে পারেতো না সম্ভবতঃ।

তীব্র আগুনঝরা দৃষ্টিতে মল্লিকাকে লক্ষ্য করে বিজন বলে উঠলো-
-মেয়েছেলেদের সাহিত্য নিয়ে নাচানাচির কারণটা আমি বুঝি। ঘরের মানুষে যখন মন ওঠে না তখন খুব সহজেই বাইরে ঢলাঢলি করা যায় পদ্য-টদ্য লিখে। অনেকগুলো অকর্মণ্য ইল্লি-বিল্লি জুটে যায় চারপাশে। এসব নষ্টামি আমি ঢের জানি, বুঝলে?
তীব্র গরলে মল্লিকাকে নীল করে দিয়ে বিজন ফের দেওয়ালের দিকে ফিরে শুয়ে পড়লো। অথচ এই বিজন প্রতিদিন শেভ্ করে কোট-প্যান্ট-টাই পরে অ্যাটাচি হাতে যখন অফিসে যায়, সৌজন্য বিনিময়ের হাসি হাসে, চমৎকার ঢঙে কথা বলে তখন সেই বিজনকে মল্লিকা বুঝতে পারে না। এই বিজনকেই সে স্পষ্ট করে বোঝে। এই বিজনই তার যাবতীয় রোদ্দুর আড়াল করে দাঁড়িয়ে আছে বলেই অন্ধকার থেকে আলোয় দৌড়োবার তীব্র আবর্তে মল্লিকা প্রতিনিয়ত ছটফট করে। মল্লিকা প্রতিমুহূর্তে অনুভব করে তার আকাশটা বড্ড ছোট। সেই আকাশটুকুও বিজন তার আশি কেজি ওজনের রোমশ শরীর দিয়ে সর্বদা ঢেকে রাখতে চায়! প্রস্তুতি নয়, আবেগ নয়, খুশির ঢেউ তোলা নয়, বিজন তার জান্তব স্পৃহা মেটাতে মল্লিকা নামের যন্ত্রটাকে ব্যবহার করতে পারেনি-তাই সমাজ ও লোকচক্ষুর আড়ালে বিজনের এই অন্য চেহারা। এই বিজনকে সে সকলের সঙ্গে পরিচয় করাবে কি করে?
ভাবতে ভাবতে ভোর হয়ে এল। আর একটা ক্লেদাক্ত রাত কেটে গেল নির্ঘুম। মল্লিকা নিঃশব্দে বিছানা থেকে নেমে এসে মেঝেয় পড়ে থাকা কাগজগুলো একটা একটা করে তুলে নিল। তার বেঁচে থাকা জীবনের আসল মানেটা এই কাগজগুলোর মধ্যেই ছড়িয়ে আছে। যে কোনো মূল্যে মল্লিকা এই মানেটাকেই রক্ষা করে যাবে। বিজনের কাছে হার না মানার সঙ্কল্প নিয়ে মল্লিকা শোবার ঘরের দরজা হাট করে খুলে দিল।


দৃশ্য দুইঃ

 

কাব্য নাটকটা শেষ হয়েছে এই খবরটা সকালেই মল্লিকা ফোন করে জানিয়ে দেওয়ায় অনেকটা নিশ্চিন্ত বোধ করছে নীলাঞ্জন। অফিস যাওয়ার পথে মল্লিকার স্কুল থেকে পান্ডুলিপিটা নিয়ে ‘স্বদেশ’ পত্রিকার বিশেষ সাহিত্য সংখ্যার জন্যে সম্পাদককে জমা দিয়ে দেবে। পথেই শেষাংশটুকু পড়ে নেবে। দিন দিন মল্লিকার লেখার জোর বাড়ছে। নীলাঞ্জনের অভিজ্ঞতা বলছে মল্লিকা অনেকদূর যাবে। ‘স্বদেশ’ সম্পাদক সুধাময়দাও একই বিশ্বাস পোষণ করছেন। তিনি চান মল্লিকা লেগে থাকুক। নিজের গল্পটা শেষ করে কয়েকটা পাতা লিখতে লিখতে মল্লিকার কথাও ভাবছিল নীলাঞ্জন, নিটোলভাবে নয়, টুকরো টুকরো ভাবে। লিখতে লিখতে অন্য কোনো ভাবনা ফাঁক-ফোকড়ে অনুপ্রবেশ করলে লেখাটার জন্যে একটু সময় বেশি লাগে মাত্র। লেখার অঙ্গহানি ঘটে না।
-আজ বুবানের স্কুলে সাড়ে এগারোটায় যেতে হবে, মনে আছে তো?
টেবিলের একপ্রান্তে কফির কাপটা ঠক্ করে নামিয়ে নীলাঞ্জনকে চমকে দেওয়ার ব্যাপারটা সেরে অঞ্জলি অত্যন্ত দ্রুত জরুরি কথাটা মনে করিয়ে দিল। কিন্তু যথারীতি বিপন্ন বিস্ময়ে নীলাঞ্জন দু’এক মুহূর্ত ফ্যাল ফ্যাল করে অঞ্জলির মুখের দিকে তাকিয়ে রইলো। ভ্রূ বেঁকিয়ে ঠোঁটে বাঁকা হাসি ঝুলিয়ে অঞ্জলি ফের বলে উঠলো,
-মল্লিকাকে সময়টা দিয়ে দিলে বুঝি?
আর একবার ভিতরে ভিতরে চমকে উঠলো নীলাঞ্জন। কিচেনের মিশ্রিত শব্দ ছাপিয়ে মল্লিকার সঙ্গে ফোনে সামান্য দেড় মিনিটের কথাটাও কান পেতে ‘রিসিভ’ করে নিয়েছে অঞ্জলি! নীলাঞ্জনকে বলতে হলো-
-আসলে দিন সাতেক আগে কথাটা বলেছিলে তো-তাই ঠিক মনে নেই-
-কি করে থাকবে? ঠিকই তো-লেখক বলে কথা! আসলে কি জানো, আমি তোমার রান্নাঘর থেকে বিছানা সব কিছুই সামলাই। আর মল্লিকা তোমার মতোই লেখে পত্রপত্রিকায়। তোমাদের লেখা একসঙ্গে ছাপা হয়। মল্লিকার কথা ভোলার কোনো উপায়ই নেই-
-বড্ড বাজে কথা বলো তুমি। বিচ্ছিরি এক ঈর্ষায় তুমি অকারণে আমাকে আজেবাজে কথা বলে বলে প্ররোচিত করছো কিন্তু!
-অর্থাৎ আমার ঈর্ষার কারণেই তুমি মল্লিকা-গত প্রাণ হবে। ফাইন!
-অসম্ভব! তোমার সঙ্গে কথা বলাটাই-
-ইদানীং ভীষণ বোরিং! বুবান ক্লাস নাইনে পড়ছে। তিতলি ক্লাস সেভেনে। চারজনের সংসারে তেল-কালি মাখতে মাখতে আমিও কিম্ভূত হয়ে গেছি। তোমার আলমারিতে বিয়ের একবছরের মধ্যে ছাপা ‘নীলাঞ্জলি' পদ্যের বইটা কি এখনও আছে?

অপরিণত কবির কলমে অঞ্জলির সে কী রূপ, কী প্রণয়াবেগ-
-অফিসে আমার জরুরি কাজ আছে, এখন আর চেঞ্জ করার উপায় নেই-
-আমি জানতাম। কারণ এটাই এখন রেওয়াজ হয়ে গেছে। আমি যা-ই বলি না কেন সেটা ইগনোর করাটাই তোমার অভ্যাস হয়ে গেছে-
-সামান্য একটা কথার সূত্র ধরে তুমি অজস্র অনাবশ্যক কথা বলে চলেছো অঞ্জলি। লেখাটা আমায় এখনই শেষ করতে হবে, প্লিজ!
-প্রেমের গল্প নিশ্চয়ই! তুমি তো ইদানীং পদ্য ছেড়ে গল্প লিখে বেশ নাম করেছো শুনতে পাই। তোমার গুণমুগ্ধ শালী তো তোমায় একালের বিশিষ্ট প্রেম বিশারদ বলে মনে করে। তোমার শালী কিন্তু আমার মায়ের পেটের বোন, এটা মনে রেখো কিন্তু...
-কি বলতে চাইছো তুমি?’ এতক্ষণে নীলাঞ্জনের কণ্ঠে উষ্মার আঁচ পেল অঞ্জলি। ভেতরে ভেতরে সে এটাই চাইছিল।
-মল্লিকার গাধা হোক উজবুক হোক একটা বর আছে। মল্লিকার সঙ্গে তুমি যা খুশি করতে পারো। আমার বোনের সঙ্গে পারো না।
-তোমার পাগলামি ক্রমশঃ বরদাস্তের বাইরে চলে যাচ্ছে। ইদানীং তোমার মুখে যা আসছে বলে যাচ্ছো-
-পরিকল্পনামাফিক চেষ্টা করেও তুমি আর মল্লিকা আমায় পাগল প্রমাণ করতে পারবে না। আমার দাদা উচ্চপদস্থ হেলথ্ অফিসার। এছাড়া অন্য কোনো কারণ দেখিয়ে তুমি আমায় ডিভোর্স করতে পারবে না। কোনো অবস্থাতেই আমিও তোমায় ডিভোর্স দেবো না। খুবই মুশকিলে পড়েছো তুমি!
নীলাঞ্জন রীতিমতো উদ্বেগের সঙ্গেই অঞ্জলির মুখের দিকে তাকিয়ে রইলো কয়েক সেকেন্ড।

একজন মনোবিদের পরামর্শ নেওয়া উচিত বলে তার মনে হলো। এই অঞ্জলিকে নিয়ে বেশ কয়েকটা প্রেমের কবিতা লিখেছিল নীলাঞ্জন। তখন কবিতাই লিখতো। বিশেষ করে বিয়ের বছরখানেকের মধ্যে বলতে গেলে কবিতার বান ডেকেছিল। অঞ্জলি পাশে থাকলে তখন যে কোনো বিষয়ই কবিতা হয়ে উঠতো। প্রজাপতি বৃষ্টি ঝড় আমের মঞ্জরী শিমূল পলাশ ঝর্ণার শব্দ নদীর স্রোত পাখির ডাক সবকিছুই কবিতার শব্দ হয়ে উঠতো। তারই ফলশ্রুতি প্রথম কবিতার বই ‘নীলাঞ্জলি’!
তারপর যত দিন গেছে অঞ্জলি ধীরে ধীরে বদলে গেছে আমূল। এখন নীলাঞ্জনের লেখালেখি ওর কাছে নিতান্তই মেয়েদের সঙ্গে বিশেষ করে মল্লিকার সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তোলার ছল মাত্র!
নীলাঞ্জনের কোনো লেখাই অঞ্জলি শোনে না। মতামত দেওয়া তো দূরের কথা। অনেক সময় ইচ্ছে করেই নীলাঞ্জনের পান্ডুলিপির পৃষ্ঠাগুলো এলোমেলো করে দেয়। ভেতর থেকে দু’এক পাতা সরিয়ে ফেলে। লেখালেখির জগতের লোকজনদের সঙ্গে বিচিত্র ব্যবহার করে। সাহিত্য সম্মেলন জাতীয় কোনো অনুষ্ঠানে নীলাঞ্জনকে ঘিরে মেয়েদের ভিড় অঞ্জলিকে ক্ষিপ্ত করে তোলে। সেটা বাড়ি ফেরার পর টের পেতো নীলাঞ্জন। কিছুদিন ধরে অন্তরঙ্গ মুহূর্তে আচমকা বেড স্যুইচ অন করে নীলাঞ্জনকে প্রায় শিউরে দিয়ে অঞ্জলি সরে গেছে দূরে। চাপা গলায় ঝলসে উঠেছে,
-আমি অঞ্জলি। মল্লিকা নই!
বিধ্বস্ত হতাশ নীলাঞ্জন বেড স্যুইচ অফ করে অন্ধকারে বালিশে মুখ গুঁজে ভোরের প্রতীক্ষায় ছটফট করেছে। এখন আর অন্তরঙ্গ মুহূর্ত বলে ওদের জীবনে প্রায় কিছুই নেই।
তবুও নীলাঞ্জনের আকাশটা অনেক বড়। বন্ধু-বান্ধব আছে, কফি-হাউস আছে। গল্প-কবিতা নিয়ে তর্ক-বিতর্ক আছে। মল্লিকা আছে। নীলাঞ্জনের প্রতিটি লেখা গভীর মনযোগের সঙ্গে পড়ার আন্তরিক আগ্রহ আছে। এটুকু আছে বলেই লেখার জায়গাটা ছেড়ে নীলাঞ্জন চলে যেতে পারেনি।


নীলাঞ্জন ভাবলো বাকি লেখাটুকু অফিসের ক্যান্টিনে বসেই সেরে নেবে। গল্পের শেষ কয়েকটা পাতা ওর চোখের সামনে ভাসছে, অনেকটা টিভির সংবাদপাঠকের সামনের সংবাদ লেখা টিভি স্ক্রিনের মতো। শুধু কাগজের পৃষ্ঠায় শব্দগুলো পরপর বসিয়ে নেওয়া। কলম বন্ধ করে কাগজগুলো টেবিল থেকে তুলে নেবার আগেই অঞ্জলি প্রায় ছোঁ মেরে কাগজগুলো তুলে নিয়ে প্রবল ক্রোধে টুকরো টুকরো করে ছিঁড়ে দলা পাকিয়ে বাইরে ছুঁড়ে ফেলে দিল!
অবিশ্বাস্য এই ঘটনায় ভয়ঙ্কর ভাবে জ্বলে উঠতে পারতো নীলাঞ্জন। জ্বলে উঠলোও ভেতরে ভেতরে। দাঁতে দাঁত চেপে বলে উঠলো-
-তবুও তোমাকে সহ্য করার ক্ষমতা আমার রয়েছে অঞ্জলি। কিন্তু তোমাকে ভালোবাসার ক্ষমতা আর আমার নেই।
অঞ্জলির সামনে থেকে সরে যেতে যেতে অন্যান্য দিনের মতো আজো কিছু ভাঙচুরের শব্দ শুনতে পেল নীলাঞ্জন।



দৃশ্য তিনঃ


সঞ্জয় কফির কাপটা নীলিমার সামনে রেখে পাশের চেয়ারে বসলো,
-নাও কফি খেতে খেতে লেখার ব্যাপারটা ভাবো।
নীলিমা সঞ্জয়ের চোখের দিকে তাকিয়ে একটু হাসলো। সঞ্জয় চওড়া পাড় শালটা গায়ে ভালো করে জড়িয়ে নিয়েছে। শেভ্ করাও হয়ে গেছে। চুলগুলো একটু এলোমেলো। সঞ্জয়ের টোটাল চেহারায় সবসময়ে একটা বিশৃঙ্খল সৌন্দর্য দেখতে পায় নীলিমা। ওর মন্দ লাগে না। সঞ্জয়ের পেশার মধ্যেও শৃঙ্খলা শব্দটার অবস্থান গাঢ় নয়। প্রখ্যাত একটা ইংরেজী দৈনিকের সিনিয়র রিপোর্টারদের একজন। বাঘা বাঘা রাঘববোয়ালদের সঙ্গে চমৎকার ডিবলিং করতে পারে। বিশেষ করে রাজনীতির বাচাল ও মূর্খ নেতাদের নিয়ে ওর নিয়মিত কলাম ‘খেলা’ এবং সেই খেলার সূত্রে প্রায় প্রতিদিন তৈরি করা জোকস্ নিয়ে টেবিল মাতাতে ওর কোনো জুড়ি নেই।

মাঝে মাঝে শ্লীলতার সীমা ছাড়ালেও সকেলই বেশ এনজয় করে। সাংবাদিকতার ফাঁকে ফাঁকে গল্প কবিতা রম্য ভারি প্রবন্ধ-যখন ওর মুড ওকে যেটায় প্রোভোক করে ও তাই লেখে। ওর লেখার চাহিদা আছে বাজারে, কিন্তু নিজের লেখার প্রতি তেমন কোনো মায়া-দয়াও ওর নেই।
নীলিমা বিয়ের আগে লেখালেখি করলেও বিয়ের পরে অনেকটাই সরে এসেছিল। সংসার ওকে সুযোগ দিচ্ছিল না বলে সঞ্জয়ের মনে হচ্ছিল। মনে হতেই চমৎকার একটা রুটিন তৈরি তার মধ্যে নীলিমাকে জুড়ে দিল সে। লেখার জন্যে পড়ার জন্যে এমন কি ভাবার জন্যেও সময় হাতে পেয়ে নীলিমা প্রায় নেচে উঠলো। ওর দায়িত্ব শুধু লেখার। বাকি সবটুকু দায় সঞ্জয়ের। পত্র-পত্রিকায় নীলিমার লেখা প্রকাশিত হয়। চারপাশে প্রশংসার প্রজাপতি ওড়াউড়ি করে। মাঝে মধ্যে দু’একটা ভ্রমরের গুঞ্জনও যে কানে আসে না তা নয়, কিন্তু সঞ্জয় যার স্বামী এবং বন্ধু তার পক্ষে অন্য দিকে তাকাবার সময় হাতে থাকে কি করে?
-কখন ঘুম থেকে উঠলে টের পাইনি।’ কফিতে চুমুক দিয়ে নীলিমা অবাক হয়ে তাকালো সঞ্জয়ের দিকে।
-জাস্ট আধঘন্টা আগে। আড়াল থেকে লক্ষ্য করছিলাম তুমি কিছু একটা ভাবছো। তাই ডিস্টার্ব না করে-
-রাত তিনটেয় বাড়ি ফিরে ছ’টায় ঘুম থেকে উঠে ফিট-ফাট হয়ে যাও কি করে কে জানে! মাত্র তিন ঘন্টা ঘুম-
-তিন ঘন্টা নয় ম্যাম্-আজ মাত্র দু'ঘন্টা। তিনটেয় ফিরে ভোর চারটে পর্যন্ত তোমাকে নিয়ে যে দারুণ ব্যস্ত ছিলাম-
-যাহ্! কিন্তু জানো, ঐ সময়টা আধো ঘুম আধো জাগরণের মধ্যে থাকি তো-মনে হয় স্বপ্ন দেখছি, সন্ধ্যে থেকে সারা রাতের প্রতীক্ষা ভোরে গিয়ে স্বপ্ন হয়ে জেগে ওঠে।

নীলিমার পরিতৃপ্ত মুখের মধ্যে এক চিলতে রোদের আভা।
-তোমার কথাগুলো...আই মীন তোমার ফিলিংসগুলো যেভাবে তুমি অনায়াসে প্রকাশ করো আমি ঠিক ঐ ভাবে পারি না। কথাগুলো খুব চমৎকার সাজাও তুমি। আমার খুব ভালো লাগে।
--তোমার হয়তো মনে হয় গল্পের কোন একটা চরিত্র লেখকের মর্জি মতো ঠোঁট নাড়ছে--
--একেবারেই মনে হয় না। যারা লেখে ছবি আঁকে গান গায় তারা ভীষণভাবে সংবেদনশীল আবেগপ্রবণ হয়। তাদের উচ্চারিত প্রতিটি শব্দ যদি কান পেতে শোন তাহলে দেখবে তার মধ্যে গেরস্থালী শব্দ প্রায় থাকেই না। তুমি হয়তো লক্ষ্য করে থাকবে যেকোন সেন্টিমেন্টাল কথাবার্তায় মল্লিকার চোখে জল এসে যায়। তোমারও আসে--
--মোটেও না। আমি ওর মতো অত বেশি ভাবুক নই।
--আমি তোমার পাশে তোমার মনের মতো হয়ে আছি বলেই হয়তো--
--‘মনের মতো হয়ে আছি’ মানে কি? তুমি কি সেজে আছ নাকি? প্লে করছো?

নীলিমা চোখ বড় বড় করে তাকাল সঞ্জয়ের দিকে। সঞ্জয় হাসল ওর কথা শুনে। নীলিমার মাথাটা ডান হাতে একটু নাড়িয়ে দিয়ে বলল--
--দীর্ঘ ঊনিশ বছর কি সেজে থাকা যায়? তুমি কি পার?
--ভাবতেই পারি না। তবে সত্যি, মল্লিকা কিছু না বললেও বুঝি ওর চারপাশে একটা অসহনীয় শূন্যতা আছে।
--বিজন ওর হাজব্যা- কিন্তু প্রেমিক নয়--
--কিন্তু তুমিও তো হাজব্যা-। হাজব্যান্ড হলে কি প্রেমিক হয়ে ওঠা যায় না?
--জানি না, তবে আমি আগে প্রেমিক পরে হাজব্যান্ড।
--তাহলে মল্লিকার কি হবে?
--খুবই গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। তুমি কি বলতে পার নীরাঞ্জনেরই বা কি হবে?
নীলিমা ঘুরে মুখোমুখি হল সঞ্জয়ের। সঞ্জয় বলল--
--হ্যাঁ, নীলাঞ্জনের চারপাশেও এক অসহনীয় শূন্যতা রয়েছে। আমার সঙ্গে কাজ করে আমি ওর ভেতরের অস্থিরতা টের পাই।
--মল্লিকা কিন্তু নীলাঞ্জনের প্রসঙ্গে বেশ আলোকিত হয়ে ওঠে, আমি লক্ষ্য করেছি।
--মার্ভেলাস!
--কি হল?
--এই যে বললে মল্লিকা ‘নীলাঞ্জনের প্রসঙ্গে আলোকিত হয়ে ওঠে!’ একটা বাক্যের মধ্যেই পুরো মহাভারত প্রকাশ হয়ে গেল। তুমি লেখ বলেই এমন একটা বাক্য উচ্চারণ করতে পারলে!
--তবু ভাল! আমি ভাবলাম না জানি কি--
--নীলাঞ্জনই মল্লিকার প্রেম।
--কিন্তু বিজন?
নীলিমা প্রায় চেঁচিয়ে উঠল।
--অধিকারবোধ সর্বস্ব হাজব্যান্ড --- প্রেমিক নয়। মল্লিকা ওর কাছে ব্যবহারযোগ্য একটা সাংসারিক বস্তু মাত্র!
--আর নীলাঞ্জনের বউ অঞ্জলি?
--বিজনেরই মহিলা সংস্করণ--অধিকারবোধেই কঠিন স্ত্রী--প্রেমিকা নয়।
--তাহলে!
--মল্লিকা যে কোন মূল্যে নীলাঞ্জনের প্রেম হতে পারে--
--কিন্তু জীবনে তো নৈতিকতারও একটা প্রশ্ন আছে--
--সৃষ্টিশীল জীবনে নৈতিকতার দাসত্ব চলে না নীলিমা--নৈতিকতা পুরোপুরি গেরস্থালী শব্দ।
--কিন্তু গেরস্থালী বাদ দিয়ে তো জীবন হয় না--
--গেরস্থালী গৃহস্থদের জন্যে। গৃহস্থরাও সৃষ্টিশীল মানুষ হতে পারে। সেক্ষেত্রে নৈতিকতা কোন সমস্যা হবে না যদি তারা তোমার-আমার মতো হয়। দু’জন দু’জনের শূন্যতা যদি গ্রাস করতে না পারে, নীলিমা তাহলে নৈতিকতার ঢাল ব্যবহার করে আত্মরক্ষার চেষ্টাটা শুধু অর্থহীনই নয়--মারাত্মক যন্ত্রণাদায়কও হয়ে ওঠে।
--তাহলে কি ওরাও--
--ওদের নিয়ে ভেবো না। ওরা যদি পরস্পরের শূন্যতা গ্রাস করে নিতে পারে নিক না!

 

উপসংহারঃ

পরিচালন সমিতির এক সদস্যের মৃত্যুতে স্কুল ছুটি হয়ে গেল। নীলাঞ্জনের আসার কথা সাড়ে এগারোটায়। স্কুলের বাইরেই দেখা করা ভাল ভেবে ব্যাগ কাঁধে ঝুলিয়ে উঠে পড়ল মল্লিকা। নীলিমাও উঠে পড়ল। দু’জনে একসঙ্গে স্কুলের বাইরে বেরিয়ে গেটের পাশে দাঁড়াল। মিনিট পাঁচেক দেরি আছে এখনও।
--তোর শরীরটা কি ভাল নেই মল্লিকা?
--উঁ? হ্যাঁ, ভালই তো আছে--
মল্লিকা চমকে ইঠল। নীলিমার মুখের দিকে তাকিয়ে একটু হাসল।
--রাত্রে ঘুম হয় নি বুঝি?
--না। আসলে লেখাটা শেষ করার ছিল--তুমি তো জান।
--কারুর জন্যে অপেক্ষা করছিস?
--হ্যাঁ-মানে--
--নীলাঞ্জন আসবে?
--হ্যাঁ, লেখাটা তো ওকেই দিতে হবে--
--এত কিন্তু কিন্তু করছিস কেন? এক কাজ কর, নীলাঞ্জনের অফিস তো সেই বেলা চারটেয়। তুই বা এত সকাল সকাল বাড়ি ফিরে কি করবি? চাবিটা রাখ-আমার ঘরে ফিরতে ফিরতে সাড়ে তিনটে বেজে যাবে-একটা অনুষ্ঠানে যাবো-সঞ্জয়ও যাবে--
--না না--তোমরা কেউ থাকবে না--
--তোরা তো থাকবি! গল্পগুজব করবি। কিচেনে কফি-মেকার আছে--এক মিনিটে দু’কাপ কফি! রাস্তায় ঘুরবি নাকি? নে রাখ--

প্রায় জোর করে মল্লিকার হাতে ঘরের চাবিটা গুঁজে দিল নীলিমা। মিনিবাস থেকে উল্টো দিকের ফুটপাতে নেমে দাঁড়িয়েছে নীলাঞ্জন। পরনে পাজামা-পাঞ্জাবি। কাঁধে শান্তিনিকেতনী ঝোলা ব্যাগ। দূর থেকেই বোঝা যাচ্ছিল শেভ্ করেনি।
--নীলাঞ্জন এসে গেছে। ভাবিস না কিছু। নিজের মনের নির্দেশকে উপেক্ষা করে জীবনটাকে বিষাক্ত করিস না, কেমন?
বিস্মিত মল্লিকার হাতে মমতার স্পর্শ গুঁজে দিল নীলিমা।
--স্কুল ছুটি হয়ে গেল নাকি?
--হ্যাঁ। নীলাঞ্জন, অনেকদিন তুমি আমাদের ওখানে যাও না--দাদার সঙ্গে ঝারপিট হয়নি তো?
নীলিমার চোখে স্পষ্ট কৌতুক লক্ষ্য করে হেসে ফেললো নীলাঞ্জন।
--না না বৌদি, সেসব কিছু নয়--আসলে সময়টাই কারণ--
--ঠিক আছে। আজ মল্লিকাকে নিয়ে যাও। চাবি দিয়ে দিয়েছি। আমরা সাড়ে তিনটের মধ্যেই ফিরবো--
--সে কী! কিন্তু--’ হাত নাড়তে নাড়তে একটা মিনিবাসে উঠে পড়লো নীলিমা।
--ভালোই হলো--ভাবছিলাম তোমার সঙ্গে কোথাও বসে কিছুক্ষণ কথা বলি--
--কিন্তু সঞ্জয়দা কি ভাববেন?’ মল্লিকা ইতস্ততঃ করছিল। নীলাঞ্জন বললো--
--নীলিমা বৌদি যা ভাববেন সঞ্জয়দাও তাই ভাবেন। অন্যরকম কিছু ওরা ভাবেন না--
--খুব আশ্চর্য মনে হয় না?
--হয়। তবে এটাই তো হওয়া উচিত।
--অথচ কেন যে হয় না!
ঘরে ঢুকে ভেতর থেকে দরজা বন্ধ করতে গিয়ে হাতটা কেঁপে গেল মল্লিকার। ফ্ল্যাটের দরজা খুলে রাখা যায় না। অথচ বন্ধ করতেও কোথায় যেন দামামা বাজে!
--তোমার লেখাটা এনেছো?
--হ্যঁ, এই নাও--

ব্যাগ থেকে লেখাটা বের করে নীলাঞ্জনের হাতে তুলে দিল মল্লিকা। নীলাঞ্জন দ্রুত শেষের দিকের পাতাগুলো চোখের সামনে মেলে ধরলো। মল্লিকা একটা চেয়ারে বসে ব্যাগটা টেবিলের কোণায় রেখে আঁচল দিয়ে ঘাড়-গলা-মুখ মুছে নিল। টেবিলের সামনের চেয়ারে বসে মল্লিকার সদ্য সমাপ্ত কাব্যনাটক পড়ছে মন দিয়ে নীলাঞ্জন।

নীলাঞ্জনের আজকের চেহারায় কোথায় যেন একটা ঝড় শেষের ছাপ ফুটে উঠছে। প্রতিদিন নিয়ম করেই শেভ্ করে। আজ করেনি। অফিস যাওয়ার সময়টুকু ছাড়া অন্য সময়ে সাধারণতঃ পাজামা-পাঞ্জাবী পড়লেও সেগুলো পাটভাঙ্গা ঝকঝকে লাগে। আজ মনে হচ্ছে কয়েকদিনের ব্যবহৃত পোশাক-ই পরেছে।
--যেমনটা শেষ হওয়ার কথা ছিল তেমনটাই হয়েছে। তবে কয়েকটা শব্দ এবং লাইন যদি একটু বদলে দাও তাহলে মনে হয়--
--‘করে দাও—’ পেন খুলে নীলাঞ্জনের হাতে ধরিয়ে দিল মল্লিকা।
--‘তুমি করলেই তো ভালো হতো!’ নীলাঞ্জনের দ্বিধা দেখে খুব নরম করে একটু হাসলো মল্লিকা--
--এই পযন্ত যে আমি এসেছি তা তো তোমারই জন্যে নীলাঞ্জন! প্রথম পরিচয়ের পর থেকে তুমি আমাকে তিল তিল করে গড়ে তুলেছো। এখন তোমার এত দ্বিধা কেন?
--না-তা ঠিক নয়--
--ঠিক করে দাও-প্লিজ!
নীলাঞ্জন প্রয়োজনীয় শব্দ বদল করে করে মল্লিকাকে শোনালো। মুগ্ধ বিস্ময়ে মল্লিকা নীলাঞ্জনের মেধার কথা ভাবছিল মনে মনে। ঠিক এমনটাই তো হওয়ার কথা ছিল-!
--এখন এটা আমি জমা দিয়ে দিতে পারি--
--‘তোমার গল্পটা দাও, পড়ি-’ মল্লিকা হাত পাতলো। নীলাঞ্জন ম্লান হাসলো একটু। বলল-
--আমি আর লিখবো না মল্লিকা। আমাকে দিয়ে আর এসব হবে না।
ঝড়ের সন্দেহটা সত্যি মনে হলো মল্লিকার। নিঃশব্দে উঠে নীলাঞ্জনের চেয়ারের পেছনে দাঁড়িয়ে নীলাঞ্জনের মাথাটা দু’হাতে টেনে নিজের বুকের ওপর চেপে ধরে মল্লিকা বলল--
--এক্ষুণি এখানে বসে লেখাটা তুমি শেষ করবে। কোনো কথাই আমি শুনবো না। তুমি না লিখলে আমি লিখবো কি করে!
--আর তা হয় না--
--হতেই হবে। আমি জানি--অঞ্জলি বৌদির হেনস্থায় তুমি ভেঙ্গে পড়েছো। আমার কথাটা তো তুমি জানো না--জানলে তুমি নিজেকে এত দুর্বল ভাবতে না--
--লেখার জন্যে ভাবার জন্যে জীবনে দু’একটা খোলা জানলার প্রয়োজন অত্যন্ত জরুরি মল্লিকা--
--জানি। আমিও ভীষণভাবে ফীল করি সেটা। আমারও দম বন্ধ হয়ে আসে মাঝে মাঝে। আমরা কি পরস্পরের খোলা জানলা হতে পারি না?’ নীলাঞ্জনের এলোমেলো চুলের মধ্যে নিজের মুখটা ডুবিয়ে দিয়ে প্রাণপণে নিজের আবেগ সামলাবার চেষ্টা করে মল্লিকা।
--কিন্তু সমাজ সংস্কার!
--থাকুক না যে যার জায়গায়।
--কিন্তু আমাদের ভবিষ্যত?
--‘লেখার মধ্যেই গড়ে উঠুক না কেন!’ নীলাঞ্জন হাত বাড়িয়ে মল্লিকাকে সামনে টেনে এনে ওর চোখে চোখ রাখলো। মল্লিকা নীলাঞ্জনের মুখটা নিজের দুই করতলের মধ্যে ধরে বলল,
--কতদিন তোমার মুখটা এইভাবে ধরে আমি অজস্র কথা বলেছি জানো! দু:খে যন্ত্রণায় তোমার এই চোখ এই মুখ আমাকে কিভাবে রক্ষা করেছে তুমি জানো না--
নীলাঞ্জন দুহাতে মল্লিকার কোমর জড়িয়ে ওর বুকের নিচে মাথাটা গুঁজে দিল নিঃশব্দে। মল্লিকা ফিস ফিস করে বলে উঠলো--
--নীলাঞ্জন! আজ এই প্রথম নিজেকে আমার মেয়ে-যন্ত্র বলে মনে হচ্ছে না--আমার শরীর আমি ফিরে পাচ্ছি, বিশ্বাস করো!

***