ভাষার পক্ষপাতিত্ব

গৌতম রায়

 

 

 জেন্ডার-নিউট্রাল ল্যাঙ্গুয়েজ বা লিঙ্গ-নিরপেক্ষ ভাষার ব্যবহার নিয়ে তর্ক-বিতর্ক এবং আলোচনা ক্রমেই জমে উঠছে পশ্চিমা বিশ্বে, বিশেষ করে সেখানকার ইউনিভার্সিটিগুলোয়, যেখানে ভাষাতত্ত্ব ও ভাষাবিজ্ঞান নামে আলাদা একটি বিষয় রয়েছে। এই ইউনিভার্সিটিগুলো ছাড়াও বিভিন্ন স্টাডি গ্রুপে সম্প্রতি সময়ে নারী ও পুরুষের প্রতি ভাষার আলাদা আলাদা দৃষ্টিভঙ্গি এবং ব্যবহার, শব্দচয়নে পুরুষের প্রতি ভাষার প্রবল পক্ষপাতিত্ব এবং নারীর প্রতি ভাষার উদাসীনতার বিষয়টি আলোচনায় উঠে আসছে প্রবলভাবে। একসময় মনে করা হতো, ভাষা কখনোই নারী কিংবা পুরুষের প্রতি আলাদা করে অবস্থান নেয় না। ভাষার অবস্থান লিঙ্গ-স্বতন্ত্র এবং নিরপেক্ষ। কিন্তু গত শতকের সত্তরের দশক থেকে ভাষা নিয়ে কিছু স্টাডি এবং প্রধানত ইউরোপের নারীবাদীরা সবার চোখে স্পষ্ট করে দেখিয়ে দেয়, বর্তমান সময়ের ভাষা কোনো অবস্থাতেই লিঙ্গ-নিরপেক্ষ নয় এবং ভাষা প্রবলভাবে পুরুষতান্ত্রিক। প্রায় একই সময়ে লিবারেল একদল গোষ্ঠী বিভিন্ন ভাষার প্রকৃতি বিশ্লেষণ করে প্রমাণ করার চেষ্টা করে- ভাষা ‘প্রবলভাবে পুরুষতান্ত্রিক’ না হলেও অধিকাংশ সময়েই নারীর প্রতি উদাসীন। লিবারেলদের এই মত নারীবাদীরা তখন মেনে না নিলে যে প্রকাশ্য তর্ক-বিতর্কের সূচনা হয়, সেখানে লিবারেলরা শেষ পর্যন্ত তাদের অবস্থান বদলে স্বীকার করতে বাধ্য হন যে, ভাষার এই উদাসীনতা শেষ পর্যন্ত নারীর স্বকীয়তা ও অধিকারের বিরুদ্ধে অবস্থান নেয় বলে তা পুরুষতান্ত্রিক হতে বাধ্য।

নারীর বিরুদ্ধে কিংবা পুরুষের পক্ষে ভাষার এই অবস্থান দেখা যায় কথ্য ও লেখ্য- দু’ভাবেই। মানুষের মুখ এবং হাতের মাধ্যমে প্রকাশ ছাড়া ভাষার আলাদা কোনো অস্তিত্ব নেই বলে অনেক তাত্ত্বিক প্রকৃতিগতভাবে ভাষাকে অনিরপেক্ষতার দোষ থেকে রেহাই দিতে চাইলেও নারীবাদীরা দেখিয়েছেন, এই ধরনের রেহাই দেয়ার অর্থ দাঁড়ায় ভাষাকে বর্তমান দোষত্রুটিগুলো নিয়েই চালিয়ে যাওয়ার স্বীকৃতিস্বরূপ। বিশেষ করে কথ্যরূপের চাইতে লেখ্যরূপের পার্থক্যটি মাঝে মাঝে এতো বিশাল হয় যে, তখন ভাষাকে সংস্কার করা ছাড়া আর কোনো উপায় থাকে না। কথ্যরূপের পাশাপাশি সংস্কারের মাধ্যমে লেখ্যরূপকেও বদলাতে প্রচুর কাঠখড় পোড়াতে হয়। তবে লেখ্যরূপ পরিবর্তন করার মাধ্যমে অ্যাকাডেমিক্যালি কথ্যরূপকে তুলনামূলকভাবে তাড়াতাড়ি পরিবর্তন করা যায়, সে স্বীকৃতি তাত্ত্বিকদের কাছ থেকে পাওয়া যায়।

ভাষার এই লেখ্যরূপ বদলাতে গত শতকের সত্তরের দশকে ভাষা নিয়ে কাজ করা নারীবাদীরা যে বিতর্ক তুলেছিলেন, তার ফলাফল পাওয়া যেতে থাকে আশির দশকে এসে ইউরোপের স্কুল-কলেজগুলোতে। এসময় স্কুল-কলেজের পাঠ্যবইয়ে প্রচুর পরিবর্তন আসতে থাকে। এখানে বলে রাখা দরকার, ইন্দো-ইউরোপিয়ান এবং আফ্রো-এশিয়াটিক ভাষার ক্ষেত্রে পুরুষতান্ত্রিক মনোভাব খুব প্রবলভাবে দেখা যায়। তবে ভাষার এই পরিবর্তন প্রধানত ইন্দো-ইউরোপিয়ান ভাষাগোষ্ঠীর ক্ষেত্রেই ঘটতে দেখা গেছে। এশিয়া কিংবা লাতিন আমেরিকার দেশগুলোতে শেষ দশকে এসে এ নিয়ে কাজ শুরু হলেও এখন পর্যন্ত খুব একটি পরিবর্তন সেখানে আসেনি। ইউরোপের সবচাইতে জনপ্রিয় ভাষা ইংরেজির ক্ষেত্রে পরিবর্তন আসে খুব তাড়াতাড়ি এবং এই পরিবর্তনগুলো ‘ক্ল্যাসিক্যাল ইংরেজ’দের কাছে তেমন জনপ্রিয় না হলেও মার্কিনিদের ইংরেজি ভাষা দ্রুত রিফর্মের কারণে ইংল্যান্ডের তরুণ গোষ্ঠী সহজেই এই রিফর্মগুলো গ্রহণ করে নেয়। Man শব্দটি দ্রুতই পরিণত হয় Person-এ। রাতারাতি Chairman পরিণত হন Chairperson-এ কিংবা Spokesman হয়ে যায় Spokesperson। বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে দক্ষ Manpower-রা রাতারাতি বদলে যান দক্ষ Workforce-এ। নারীবাদীরা সে সময় আশা করেছিলেন যে, স্কুল-কলেজ কিংবা ইউনিভার্সিটির পাঠ্যবইয়ে পরিবর্তিত এই শব্দগুলো আস্তে আস্তে ভাষার সামাজিক ব্যবহারকেও প্রভাবিত করবে এবং এই ধরনের পরিবর্তন সমাজে স্থায়ী হবে। তাদের সে আশা এখন প্রায় সত্যি এবং ইংরেজি ভাষায় লিঙ্গ-নিরপে শব্দ সংখ্যা এখন সবচাইতে বেশি।

তবে ভাষার এই ধরনের পরিবর্তনকে কী নামে আখ্যায়িত করা হবে, তা নিয়ে আশির দশকে শুরু হয় নতুন বিতর্ক। বিভিন্ন মহল থেকে বিভিন্ন ধরনের নাম এবং নামের ব্যাখ্যা আসতে থাকে। ‘Inclusive Langaguage’, ‘Gender-inclusive language’, ‘Gender generic language’, ‘non-discriminatory language’ ইত্যাদি নানা নাম আসতে শুরু করলেও কোনোটিই গৃহীত হয়নি শেষ পর্যন্ত। কারণ এই নামকরণের পেছনেও যে সব কারণ বা ব্যাখ্যা দেয়া হচ্ছিলো, সেগুলোর প্রকৃতি বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, অধিকাংশ পুরুষই (যারা নামকরণ করছিলেন, তাদের অধিকাংশই পুরুষ) বোঝাতে চাচ্ছেন- তারা এর মাধ্যমে নারীকে কিছু বাড়তি সুবিধা দিচ্ছেন কিন্তু ভাষায় পুরুষের যে অধিকার এবং ভাষার পুরুষতান্ত্রিক মনোভাবকে তারা বিসর্জন দিতে রাজি নন। যদিও এই নামগুলোর মধ্যে দু’একটি সত্যিকার অর্থেই চমৎকার; কিন্তু পুরুষতান্ত্রিক ব্যাখ্যার ফলে সেগুলো শেষ পর্যন্ত নারীবাদীদের কাছে পাত্তা পায়নি এবং গৃহীতও হয়নি। Inclusive শব্দটি দিয়ে অনেকে ভাষা ব্যবহারে নারী-পুরুষ সমতা বোঝানোর চেষ্টা করলেও সাধারণ ইংরেজিতে He শব্দটি Inclusive-এর আওতায় পড়ে না বলে অনেকে এর বিরোধীতা করেন। অন্যদিকে একদল গোষ্ঠী Gender accurate নামে নতুন একটি শব্দ ব্যবহার করতে চাইলেও ভাষার ক্ষেত্রে Accuracy-এর কোনো স্থান নেই বলে তাও বাতিল হয়। অবশ্য এই শব্দটি নিয়ে বিতর্ক চলছিলো বহুদিন। কারো মতে, ভাষার Accuracy বা সঠিকতা বলে কোনো টার্ম ব্যবহার করা না যেতে পারে, কিন্তু যতোদিন পর্যন্ত না ভাষার প্রচলিত নিয়মকানুন বদলানো না হয়, ততোদিন প্রচলিত নিয়মকেই সঠিক বা শুদ্ধ বলে ধরতে হবে।
 

 নামকরণের এতো সব বিতর্কের মাঝে শেষ পর্যন্ত Gender Neutral শব্দগুচ্ছই সর্বাধিক মানুষের স্বীকৃতি লাভ করে। যদিও ভাষাতাত্ত্বিকদের মতে, আধুনিক ডিসকোর্সে Gender Neutral Language-এর চাইতে Inclusive Language সর্বাধিক গ্রহণযোগ্য, কিন্তু Neutral শব্দের ‘নিরপেক্ষ’ ভাবমুর্তির কাছে হার মানতে হয় Inclusive-কে।

আধুনিক সমাজে বিশেষ করে ইউনিভার্সিটিগুলোতে নতুন এই ভাষাচর্চার কাজ ভালোভাবেই চলতে থাকে। কিন্তু গোল বাধে ধর্মের ক্ষেত্রে। ইউরোপের উদাহরণগুলোই যেহেতু আমাদের কাছে আছে, তাই খ্রিস্ট ধর্মের উদাহরণই এখানে উপস্থাপিত হচ্ছে। The Gender-Neutral Language Controversy লেখায় Michael D. Marlowe দেখান ধর্মের ক্ষেত্রে ভাষা ব্যবহারে পুরুষাধিপত্য প্রবল। এমনকি ‘মানুষ’ সংজ্ঞার আওতায় কেবল পুরুষকেই বিবেচনা করা হচ্ছে। তিনি উদাহরণ দিয়ে দেখান-

‘This is the book of the generations of Adam. In the day when God created man, he made him in the likeness of God. He created them male and female, and he blessed them and he named them Man in the day when they were created.’ (Genesis 5:1,2)

উপরের লাইনগুলোর বোল্ড অংশগুলো থেকে পরিষ্কার বোঝা যাচ্ছে, God-কে বোঝানো হচ্ছে পুরুষ হিসেবেই। এবং নারী ও পুরুষকে একত্রে চিহ্নিত করা হচ্ছে Man হিসেবে। এই সমস্যাটি প্রবল হয়ে দেখা দেয় ধর্মে বিশ্বাসী কিন্তু ভাষার সংস্কারে সম্মত বা উদগ্রীব তরুন ও যুবকদের মাঝে। দু’ক্ষেত্রে বিরোধ দেখা দেয় প্রবলভাবে। এই সমস্যা মেটাতে সংস্কারপন্থীদের প থেকে চার্চকে God Himself-এর পরিবর্তে God Godself লেখার প্রস্তাব দেয়া হলে তা মেনে নেয়া হয়। এবং এর পর থেকেই মূলত ইংরেজি ভাষায় বিশেষ করে লেখার ক্ষেত্রে পরিবর্তন ঘটেছে দ্রুত এবং উল্লেখযোগ্যহারে।

একটি অঞ্চলের মানুষের কথ্য ভাষা থেকে সে অঞ্চলের মানুষের জীবনযাপন প্রণালী এবং সংস্কৃতির প্রাথমিক পরিচয় পাওয়া যায়। পাওয়া যায় তাদের ভাষার বৈষম্যগত পরিচয়টিও। সেখানে যদি শব্দ দ্বারা নারী ও পুরুষের প্রতি আলাদা মনোভাব প্রকাশ করা হয়, তাহলে বাইরের কারো পক্ষে সেই সংস্কৃতিকে ভুল বোঝার অবকাশ থাকে। অপরদিকে অধিকাংশ ইন্দো-ইউরোপিয় ভাষাই প্রকৃতপক্ষে ভাষা দিয়ে পুরুষের ক্ষমতাকে প্রতিষ্ঠিত করতে চায়। দেখাতে চায়, সেই ভাষার অন্তর্গত সংস্কৃতিতে পুরুষের প্রাধান্য ও ইচ্ছাই প্রবল। আফ্রো-এশিয়াটিক ভাষার ক্ষেত্রেও একই কথা বলা যায়, যদিও এই ধারাটি ইন্দো-ইউরোপিয় ভাষার মতো এতোটা প্রবল নয়। ভাষা যেহেতু সামাজিক শক্তিকে প্রকাশ করে, তাই ভাষার মাধ্যমে পুরুষের শক্তির প্রকাশ মানেই সেই সমাজে সামাজিক শক্তিতে পুরুষের প্রবল উপস্থিতি নির্দেশ করে। সেই সঙ্গে সেই সমাজে নারীর অবস্থান যে দুর্বল এবং নারীর সামাজিক ও অর্থনৈতিক অবস্থান যে পুরুষের ওপর নির্ভরশীল, তাও প্রকাশ পায় স্পষ্টভাবেই। সেই সমাজের ভাষাতে নির্দিষ্ট শব্দগুলো প্রথমে পুরুষের উপস্থিতি এবং পরে পুরুষ ও নারীর যৌথ উপস্থিতি নির্দেশ করে। Chairman শব্দটি প্রথমে পুরুষের চেহারাই সবার সামনে উপস্থাপন করে এবং পরে চিন্তাকাঠামোতে জানান দেয়, এখনকার দিনে একজন নারী কিংবা পুরুষ যে কেউ Chairman বা Chairperson হতে পারে। ফলে এই শব্দটি প্রবলভাবে পুরুষতান্ত্রিক হিসেবে জাহির করে নিজেকে। নিচের তিনটি উদাহরণ লক্ষ করুন। Mankind, Poet কিংবা Actor-এর মাঝে বিলিয়ে দিতে হচ্ছে Women, Poetess কিংবা Actress-কে। Mankind যদিও Humankind-এ পরিণত হয়েছে অনেক আগেই, কিন্তু তা মানে কয়জনে? চতুর্থ চিত্রটি ভিন্ন। সমগ্র নার্সগোষ্ঠীর মাঝে এখনো খুব কষ্ট করে পুরুষকে নার্স বলে মেনে নিতে হয়, অনেককেই।


ভাষা যেভাবে পক্ষপাতিত্ব করে
 

তাই বলে কি কোনো শব্দই প্রথমে নারীর উপস্থিতি নিশ্চিত করে না? অবশ্যই করে। তবে এই শব্দগুলোর অধিকাংশই নারীর জন্য নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া হিসেবে ধরা দেয়। Prostitute বললে খুব কম মানুষই পুরুষ Prostitute-এর কথা ভাবতে পারে। এই পেশা যেনো নারীর জন্যই নির্দিষ্ট! শুধু ইংরেজিতেই নয়, বাংলাতেও এখন ‘পতিতা’র অধিকার নিয়ে আলোচনা হয়, ‘পতিত’ বলে পাওয়া যায় না কাউকে। অসংখ্য ‘ছলনাময়ী’ রয়েছে আমাদের সমাজে। কিন্তু ‘ছলনাময়’ কোনো পুরুষকে কি আমরা পেয়েছি? ‘কাজপাগল’ পুরুষকে দেখা হয় সাবাশির দৃষ্টিতে, ‘কাজপাগলী’ যদি হয় ঘরের কাজের, তাহলে হয়তো প্রশংসা করা হয়, কিন্তু সেটা বাইরের কাজ হলে নিন্দেটাই জুটে বেশি।

ভাষার ব্যবহারে যাতে নারী ও পুরুষের প্রতি সমান দৃষ্টিভঙ্গি প্রকাশ পায়, সে দিকে লক্ষ রেখে ইউরোপিয়ান ভাষাগুলো পরিবর্তিত হচ্ছে দ্রুত। প্রধানত সর্বনাম ও বিশেষণ প্রয়োগের মাধ্যমেই ভাষাকে পুরুষের দিকে ঠেলে দেয়া হয়। এই লিঙ্গ-বৈষম্য মেটাতে ইংরেজি, স্পেনিশ কিংবা জার্মান ভাষায় প্রণীত হয়েছে এবং হচ্ছে জেন্ডার রুল। ভাষার লেখ্যরূপে সমতা আনার প্রচেষ্টা শুরু হয়েছে অনেক দেশেই। লেখার মাধ্যমে নারীকে যেনো নির্যাতনের শিকার না হতে হয়, অধিকার না হারা হতে হয়, সেদিকে দৃষ্টি এখন ভাষা সংশ্লিষ্ট সকলের। আগামীকাল থেকে শুরু হচ্ছে মহান ভাষা আন্দোলনের মাস, আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস। অন্তত এই মাসটিকে সম্মান জানানোর জন্য আমাদের প্রিয় বাংলা ভাষাকে কি সব ধরনের বৈষম্যমুক্ত করার উদ্যোগ নিতে পারি না?